ভাষা আন্দোলন ও কিশোদের অবদান ।। মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

 


ভাষা আন্দোলন ও কিশোদের অবদান
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
 
ভাষা পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর ও আকর্ষণীয় বিষয়। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের কাছে সবকিছু বুঝার বা জানার আগ্রহ থেকে ভাষার প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। ভাষার মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটে। শিশু-কিশোর সময়ের সাথে নিজেকে গড়ে তুলতে মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্য ভাষার প্রতিও আকৃষ্ট হয় আর নতুনের সাথে পরিচিত হয়ে জ্ঞানকে বাড়ায়। এ ভাষার মাধ্যমেই মনের সব কথা প্রকাশ পায়। ফলে ভাষা এক অনন্য উপহার সবার জন্য।
সময় ও অঞ্চল অনুসারে ভৌগলিক কারনে ভাষার যেমন পার্থক্য থাকে তেমনি মানুষের মনের ভিন্নতার ফলেও ভাষার বৈচিত্র দেখা দেয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট বৃটিশদের তাড়িয়ে বাঙালি মুসলমানরা পাকিস্তানের সাথে নতুন আশায় দেশ গড়ে। কিন্তু মাত্র চৌদ্দ দিনের মাথায় পাকিস্তানিরা এদেশের মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দু  চাপিয়ে দেয়। কিন্তু কেউ মেনে নেয়নি। বড়দের পাশাপাশি শিশু-কিশোর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় প্রতিবাদ করে।
সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে বড়রা এ আন্দোলন বা প্রতিবাদ করে। অন্যদিকে শিশু-কিশোররা প্রতিবাদ করে তাদের ভবিষ্যতকে নিশ্চিত করতে। তারা বুঝতে পারে জন্ম থেকে যে ভাষায় কথা বলছে তা কেড়ে নেয়ার মানেই হলো তাদের নিশ্চিত ভবিষ্যতকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া। তাছাড়া অন্যভাষায় নিজের দু:খ-কষ্টগুলো অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করার যায়না। এমনকি পৃথিবীর ইতিহাসে সব সভ্যতা ও সফল মানুষ মাতৃভাষাতেই সব কিছু করেছে।
সেই বৃটিশ আমলে কবি মাইকেল মধূসূদন দত্ত যেমন ইংরেজিতে কবিতা লিখে ব্যর্থ হয়ে মাতৃভাষা তথা বাংলাতেই কবিতা লেখা শুরু করলেন। তখন থেকে তিনি সবার মনে ঠাই করে নিতে লাগলেন। অর্থাৎ মাতৃভাষার মাধ্যমেই নিজেকে যেমন তুলে ধরা যায় তেমনি অন্যের মনেও ঠাই পাওয়া যায়। এ উপলব্দি থেকেই শিশু-কিশোররা তাদের করণীয় ঠিক করে। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদ করতে থাকে।
সোনালী কাবিন নামে পরিচিত কবি  আল মাহমুদ স্কুল জীবনে ভাষার জন্য মাঠে নেমে আসেন। লিফলেটে বাংলার জন্য কবিতা লিখেন। তাঁর এ কবিতার জন্য তিনি পাকিস্তানিদের শত্রু হয়ে যান। পাকিস্তানি পুলিশ গ্রেপ্তারের জন্য তাকে খুঁজে বেড়ালে তিনি পালিয়ে যান। ফলে আর কোন দিন স্কুলে যেতে পারেননি। স্কুলে ফিরে যেতে না পারলেও তিনি ভাষার জন্য অন্যদের মতো লাড়াই করে বাংলা তথা মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ কারনে তিনি আজ বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।
সাতচল্লিশে ভাষার প্রশ্নে প্রথম তমদ্দুন মজলিস প্রথম এগিয়ে আসে। এ সংগঠনটি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে গঠিত হলেও প্রতিটি আন্দোলনে এবং সংগ্রামে শিশু-কিশোররাই ছিল মূল আকর্ষণ। ১৯৪৮ সালে ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে প্রতিবাদ সভায় উপস্থিত অধিকাংশ মানুষই ছিল কিশোর। তারা সেদিন বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ থেকে এসেছে। শিশু-কিশোরদের তমদ্দুন মজলিশের ডাকে সাড়া দেয়ার মূল কারণ হলো: এক, ভাষার মাধ্যমেই কেবল একটি জাতির পরিচয় টিকে থাকতে পারে। দুই, কুসংস্কার ও গতানুগতিকতাকে দূর করার  উপায় হলো মাতৃভাষার মাধ্যমে সবকিছু চর্চা করা। তিন, যুক্তিবাদের মাধ্যমে ধর্মীয় সহানুভুতি ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা। চার, মানবীয় মূল্যবোধ গড়ে তোলা। পাঁচ, কৃষক-শ্রমিকের মর্যাদার জন্য মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনা করা। ছয়, সঠিক চরিত্র গঠনে মাতৃভাষার বিকল্প না থাকা। এসব কারনে শিশু-কিশোরাই এক পর্যায়ে ভাষা আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠে।
বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার আন্দোলনের অংশ হিসাবে আটচল্লিশ সালের ১৩ মার্চ যশোহর শহরে শিশু-কিশোররা রাস্তায় নেমে আসে। ছাত্ররা জেলার মহাকুমা হাকিমের আদালতে উপস্থিত হয়ে গ্রেপ্তারকৃতদের ছেড়ে দিতে বাধ্য করে। যদিও সেসময় পুলিশ তাদের লাঠি চার্য করে আহত করে কিন্তু তাদের অনঢ় মনোভাবের কারণে আদালত বাধ্য হয় দাবী মেনে নিতে। তেমনি কুমিল্লা, রাজশাহী ও খুলনাতেও গুলি বর্ষণ ও লাঠি চার্জের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের প্রতিহত করার চেষ্টা করার ব্যর্থ চেষ্ট করে।
উল্লেখ্য ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে যেকজন শহীদ হন তাদের মধ্যে মো: অহিউল্লাহ ও অজ্ঞাত বালক যারা মূলত স্কুল শিক্ষার্থী ছিলেন। শিশু-কিশোরদের এ ত্যাগ গণমানুষের মনে নাড়া দেয়। ফলশ্রুতিতে ভাষার আন্দোলন আরো গতি পায় এবং বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার সম্ভব হয়। একটি বিষয় পরিষ্কার করে জানা থাকা দরকার ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রক্ত বিসর্জন দিলেও সেদিন কিন্তু বাংলা রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃতি লাভ করেনি। ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলা রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে।
মাতৃভাষার জন্য বাংলাদেশিরা আ্েন্দালন করে সফল হওয়ার কারনে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, লাটভিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ নানা দেশে নানা অঞ্চলে মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন হয়। যদিও সেসব আন্দোলনের মাধ্যমে তারা মাতৃভাষাকে রাষ্ট্র ভাষায় পরিণত করতে না পারলেও অঞ্চলিক তথা প্রদেশগুলোতে প্রধান ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে।
ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃতি লাভের পর শিশু-কিশোরদের দায়িত্ব বেড়ে গেল। ভাষার সৌন্দর্য দেখে অন্য কোন ভাষাকে অস্বীকার করা যাবে না। আবার অন্য ভাষার প্রতি প্রেম ভালবাসা দেখাতে গিয়ে নিজের ভাষাকে অবহেলার করা যাবে না।
ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি, ফার্সি, ফরাসী ও চায়না ভাষা জানা অপরাধ নয়। এসব ভাষা শিখতে হবে তাদের সম্পর্কে জানার জন্য এবং আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বিশ্বাস সম্পর্কে অন্যদের জানাতে হবে। অর্থাৎ জাতি হিসাবে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার জন্য অন্যদের ভাষা জানা দরকার। আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির পার্থক্য থাকার কারনে নিজেদের হীনমন্য ভাবা ঠিক নয়। বরং সেসব জাতি শ্রেষ্ঠ যারা নিজের ভাষাকে সঠিকভাবে মর্যাদা ও ব্যবহার করতে পেরেছে।
পরিশেষে কিশোরদের মনে রাখা দরকার আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বাংলা ভাষাতেই জানতে হবে এবং নিজের আবেগ অনুভুতি সবকিছু নিজের মাতৃভাষায় প্রকাশ করতে হবে। নিজেরা যেমন সঠিকভাবে ভাষাকে জানবো তেমনি আমদের অনুজদেরও সঠিক শিক্ষা দেব মাতৃভাষায়।
 
 মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
সহকারী অধ্যাপক
ইংরেজি বিভাগ
নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ
 
jashimnub@yahoo.com

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.