বাইরে
ঝুম বৃষ্টি। একটা গান-কোকিল একটা নি:সঙ্গ সজনে ডালে একা বসে আছে। ভিজে জুবু থুবু। অনবরত বৃষ্টির ছন্দে অসাধারণ শ্রবণনন্দন পরিবেশ। বৃষ্টির তালে তালে ডেকে যাচ্ছে কোকিলটা।
প্রিয়
পাঠক, এ রকম দৃশ্য দেখেছেন কখনো ?
২.
গভীর
রাত। নিভৃত পাড়াগাঁ। বাড়ীর বৈঠক ঘরে একা ঘুমুচ্ছেন। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলো। চারদিকে ঝিঁ ঝি’রঁ ডাক। বৈঠক ঘরের পাশে বকুল গাছ। একটা বিরহী ডাহুক আনমনে ডেকে যাচ্ছে। ঝিঁ ঝিঁ’র শব্দ আর ডাহুকের ডাক। দু’য়ে মিলে অসাধারণ সুরের দ্যোতনা তৈরী করেছে।
প্রিয়
পাঠক, এ ধরনের বিরল অভিজ্ঞতা আপনার হয়েছে কি ?
৩. উপরের দুটি ঘটনা বা অভিজ্ঞতা একেবারেই নিখাদ। প্রাকৃতিক। যিনি এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, তিনিই এ ধরনের দারুণ সব ছন্দতাল ছড়িয়ে দিয়েছেন পৃথিবী জুড়ে। প্রকৃতি জুড়েই সুর ছড়িয়ে আছে। সবখানে। বোহেমিয়ান নাগরিক জীবনেও। পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত এই ঢাকা শহরেও সুর আছে। তবে, সেই সুর শ্রবণ-ইন্দ্রিয়ে মুগ্ধতা আনে না, বিরক্তির সৃষ্টি করে।
৪. সুর নিয়ে এই ছোট আলোচনার আগে আরো দুটি প্রশ্ন
আপনাদের
কাছে রাখতে চাই। বিসমিল্লাহ খানের সাঁনাই শুনেছেন কখনো? অথবা ওস্তাদ জাকির হোসেনের তবলা? ক্যাসেটে বা টিভি অনুষ্ঠানে না, লাইভ শুনেছেন কি না ?
৫.
হযরত
নূহ (আ.) নদীর তীরে বসে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। তাঁর অসাধারণ সুরেলা তেলাওয়াত শুনতে ভীড় জমাতো মাছেরা। কোরআনের সুরের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ছিল বলে মাছেরা সকাল বেলায় নূহ (আ.) তেলাওয়াত কখনো মিস করতো না। সুরেভরা এই পৃথিবী সৃষ্টি করে আমাদের প্রভু তাঁর চমৎকারিত্ব দেখিয়েছেন। হিন্দু পুরাণ মতে, কৃষ্ণ বাঁশির সুরে রাধাকে মুগ্ধ করেছিলেন। তাই, সুরের প্রতি দুর্বলতা নেই এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন।ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে সবপ্রাণীই নিরন্তর পরিশ্রম করে। একটা কুকুরও রাতদিন খাটে। গৃহপালিত হলে নিষ্ঠার সাথে মনিবের হুকুম মেনে চলে। ক্ষুধা নিবারণের পর মানুষ সবচেয়ে বেশি যে বিষয়ের প্রত্যাশা করে সেটি হলো সুর। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনেই সুরের আবিষ্কার করেছে। এবং তা দিয়ে গান তৈরী করেছে। খৃষ্টপূর্ব যুগেও সুরেলা গীতের প্রচলন ছিলো। গানের স্টাইল তখন বের না হলেও সুরের ব্যবহার ঠিকই ছিলো। একটা গীতি কবিতায় সুর দিলেই কেবল গান হয়ে ওঠে।
৫.
যারা
গানে সুর বসাতে চান, তাদের জন্য প্রথম শর্ত হলো- শুনতে হবে প্রচুর। বিভিন্ন ধরনের গান শুনতে হবে। বিভিন্ন সুরের এবং ধরনের গান। আমেরিকার জ্যাজ থেকে শুরু করে ভারত উপমহাদেশের কাসিদা কোনটাই বাদ দেয়া চলবেনা। আমাদেও এই মাটির লোকজ সংগীত ঘেটু গান বা মুর্শিদীও শুনতে হবে। আমাদের প্রজন্মের অনেক তরুণ এ ধরনের গানের নাম কখনোই শুনেনি। এটা চরম বাস্তবতা। কিন্তু, আপনি সুরকার হতে চাইলে অবশ্যই এসব নিয়ে চর্চা অথবা ঘাটাঘাটি করতে হবে। এরপর, আপনি যদি এসব লোকজ সুরকে বর্তমান সময়ের সুরের সাথে বেঁধে দিয়ে পারেন তাহলেই সফল। আপিল বিভাগ নামে আমার একটা ভিডিও অ্যালবাম আছে। অ্যালবামটি প্রকাশ করার আগে শ্রোতাদের মধ্যে একটা জরিপ চালিয়েছিলাম। বিশেষ করে, তরুণ শ্রোতা, যারা সাধারণত মার্কেটে গিয়ে অ্যালবাম কেনে। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট বা সেকেন্ড ইয়ারের অধিকাংশ শিক্ষার্থী যা জানিয়েছিলো তাতে আমরা থ হয়েছিলাম। এরা বর্তমান সময়ের হাবিব, বালাম, তপু, হৃদয় খান অথবা বড়জোর বাপ্পার অ্যালবাম ছাড়া আর কারো গান শুনে না। এরা কাজী নজরুল, আব্দুল আলিম বা আব্বাসউদ্দিনের গান কখনোই শুনে না। এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী তারা নয়। দায়ী আমাদের অগ্রজ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। এ অবস্থাকে সামনে রাখতেই হবে। আপনি যদি সত্যিকার অর্থে একজন শক্তিশালী, পাশাপাশি জনপ্রিয় সুরকার হতে চান তাহলে বর্তমান সময় এবং অতীতের গৌরবান্বিত সুরের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে। এর বিকল্প নেই। সে কারণে গান শুনারও বিকল্প নেই।
৬.
সংগীতে
দশটি ঠাট রাগ আছে। বিলাবল, খাম্বাজ, কাফি, আসাবরী, ভৈরবী, ভৈরোঁ, ইমন, মারবা, পূরবী ও টোড়ি। রাগগুলো না জানলে অন্ধের হাতি দেখার মতো অবস্থা হবে। সুর করতে পারবেন ঠিকই, কিন্তু আপনার সৃষ্ট সুরের কি নাম সে সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাবেন। এর চেয়ে আর দু:খের কি হতে পারে। যদি সুরের প্রতি গভীর ও অনুসন্ধানী মন আপনার থাকে তাহলে প্লিজ একটা রিক্যুয়েস্ট অবশ্যই রাখার চেষ্টা করুন। জাপানের অন্যতম শ্রেষ্ঠশিল্পী মাসানোরি তাকাহাশি কিতারোর একটি বিখ্যাত অ্যালবাম পিস অন আর্থ সংগ্রহ করবেন। এ অ্যালবামে তিনি পাহাড়ী ঝর্ণা ও সাগরের ঢেউয়ের শব্দকে সুর হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গানে সুর করার আগে গানটিকে বারবার পড়তে হবে। কমপক্ষে দশবার। গীতিকার কি বলতে চেয়েছেন তা ভালোভাবে বুঝতে হবে। এ উপলব্ধির পর গানের ধরণ অনুাযায়ী সুর বসাতে হবে। স্থায়ী ও অন্তরায় সুরের বৈচিত্র্য থাকতে হবে। তবে, অন্তরা থেকে স্থায়ীতে ফিরে আসার জন্য সুরের মধ্যে একটা সেতু তৈরী করতে পারা হচ্ছে ভালো সুরকারের এক নম্বর দক্ষতা। দু নম্বরে, সুরকারকে অবশ্যই একটি গানে রাগের চমৎকারিত্ব দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে, দুটি রাগের মিশ্রণে নতুন আরেকটি সুরও তৈরী করতে পারেন। তিন নম্বর কথা হচ্ছে, বর্তমানকে মাথায় রাখতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের শ্রোতারা কি ধরনের সুর পছন্দ করে সেটি অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। আবার, কাউকে অনুসরণও করা যাবে না। শ্রোতাদের পছন্দকে সামনে রেখে নতুন সুর তৈরী করতে পারলেই আপনি সফল।
৭.
আপনার
সুর করা গান জনপ্রিয় বা সার্বজনীন না হলেও কখনো নিরাশ হবেন না। ভালো কাজ করলে একদিন না একদিন মূল্যায়ন হবেই। আর, সুর করার সময় কোন ফরমায়েশি চিন্তা মাথায় রাখবেন না। হৃদয়ের সবটুকু দরদ ঢেলে দিয়ে কাজ করুন, কেউ আপনাকে থামাতে পারবে না। জানেন তো, জীবনানন্দ দাশের কবিতা মৃত্যুর কয়েক যুগ পরে এখন যেভাবে আলোচিত হচ্ছে, বেঁচে থাকাকালীন তাঁর মূল্যায়ন করেনি কেউ। সুর সাধনার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিৎ, মানুষের মঙ্গল কামনা। এর বাইরে গেলেই বিচ্যুতি।
লেখক:
দিগন্ত টিভির বিশেষ প্রতিনিধি, সংবাদ পাঠক ও ফ্রিল্যান্স সংগীত শিল্পী
FOR ANY HELP PLEASE JOIN
🔗 MY OTHERS CHANNELS
🔗 FOLLOW ME
🔗 MY WEBSITE
🔗 CALL ME
+8801819515141
🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com
#সংগীত
#ইসলামী_সংগীত
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#বাংলাসাহিত্য
#সাহিত্য
#Molakat
#Music
#Bengali_Literature
#Literature
#আমিরুল_মোমেনীন_মানিক
No comments