আলিফ লায়লা : আরব্য রজনী_পর্ব-১০৩
ইংরেজি অনুবাদ : ডঃ জে. সি. মারদ্রুস
বাংলা অনুবাদ : ক্ষিতিশ সরকার
কামার অল হেসে সামস-এর পাপড়ি নরম গালে আস্তে একটা ঠোনা মারে।
—আমিই কী ভাবছো, তোমাকে ছেড়ে একটা রাত কাটাতে পারি? চলো আমরা এই প্রাসাদে ঢুকবো না। বাগিচা বাড়িতেই যাই।
আবার সে ঘোড়াটাকে খানিকটা ওপরে ওঠায়। তারপর অদূরে অবস্থিত সুরম্য বাগিচা-মহলের সামনে গিয়ে নেমে পড়ে। বড় মনোরম জায়গা। যে দিকে তাকায় সামস, শুধু ফুলে ফুলে ভরা। কত সহস্র রকম জানা অজানা ফুলের গাছ। বাগিচার মাঝখানে একটি স্বফটিকের ফোয়ারা। তার চার পাশে স্বচ্ছ নীল জলে কেলি করে মাছেরা। সামস অল নাহারের দু’চোখ জুড়িয়ে যায়। কামার আল বলে, এখানে দু-একটা দিন তুমি থাকো—আমিও থাকবো। তারপর সুযোগ মতো বাবাকে বলবো তোমার কথা। আমি তার একমাত্র পুত্র সন্তান। তার মনে বড় আশা, আমার শাদী হবে খুব জাঁকজমক করে। দেশ-বিদেশ থেকে আসবে হাজার হাজার অতিথি অভ্যাগতরা। তাদের সামনে শাদী হবে তার পুত্র-পারস্যের ভাবী শাহেন শহর। আমি এখন যাচ্ছি, বাবার সঙ্গে দেখা করতে হবে। কাল রাতে তাকে না বলে চলে গেছি, না জানি কত দুর্ভাবনায় কাতর হয়ে আছেন তিনি। ঘোড়াটা এখানে রইলো। একটু নজর বেখো, কেমন?
ছেলেকে দেখে বাদশাহ সাবুরের ধড়ে প্ৰাণ আসে। সারাটা রাত বিনিদ্র রজনী কেটেছে র্তার। নানা অশুভ চিন্তায় দেহ, মন অসাড় হয়ে গিয়েছিলো, কামার অলকে দেখে তিনি খুশিতে উপচে পড়েন। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে আনন্দেকাঁদতে কাঁদতে বলেন, এইভাবে বুড়ো বাপের মনে কষ্ট দিতে আছে, বেটা?
বাদশাহ সাবুর ছেলের বুদ্ধির তারিফ করেন, ভালো করেছ। সে আমার ছেলের বেগম হবে। লোকলস্কর সঙ্গে নিয়ে, শাদী-কেতায় তাকে সাজিয়ে গুজিয়ে হাজার হাজার মানুষের মিছিল করে প্রাসাদে আনতে হবে তো। তাকে নিয়ে তুমি যদি জীবনে সুখী হও তার চেয়ে আনন্দ আর কী হতে পারে আমার? তোমার মুখে হাসি দেখলে আমার সব চিন্তা ভাবনা মুছে যায়।
তক্ষুনি তিনি উজিরকে নির্দেশ দিলেন, উজির আর দেরি নয়, মিছিলের আয়োজন কর, প্রাসাদ শহর পথঘাট সাজাতে বলে। আমার ছেলের বেগম বরণ করে আনতে হবে।
বাদশাহ নিজ হাতে রত্ন-সিন্দুক খুললেন। এই সিন্দুকেই রাখা আছে পারস্যের সেরা সম্ভার। যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত করে গেছে। এতাবৎ কালের বাদশাহ। সাবুর বেছে বেছে বের করলেন সবচেয়ে দামী দামী জড়োয়ার সব গহনাপত্র। সবই হীরা মণি মুক্তাখচিত অমূল্য রত্নালঙ্কার। বংশানুক্রমে এই প্রাসাদের বেগমরা যুগ যুগ ধরে ব্যবহার করে এসেছে এই রত্ন আভরণ—।
অলঙ্কারগুলো ছেলের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, আমাদের খানদানের অলঙ্কার। অধিকার সূত্রে এসব এখন তারই প্রাপ্য। তুমি তাকে নিজে হাতে সাজিয়ে নিয়ে আসবে প্রাসাদে।
উজির আয়োজন করেছিলো শোভাযাত্রার। বিশাল বিরাট। প্রায় গোটা শহরের মানুষই বুঝি বা সেই মিছিলে সামিল হয়েছে। ধীরে মন্থর-গতিতে চলেছে শোভাযাত্রা। কামার অল-এর আর সহ্য হচ্ছিল না। এই বিলম্ব। তার প্রাণ আকুলি বিকুলি করছে সামস-এর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্যে।
কামার অল মিছিলের সঙ্গ পরিহার করে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে অন্য একটা সরু পথ দিয়ে সরে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে সে পৌঁছে যায় বাগিচা মহলে–সামস অল নাহারের বিশ্রামকক্ষে। কিন্তু একি! সামস অল কোথায়— ঘরে তো নাই সে! ফিরে তাকিয়ে দেখে, ঘোড়াটাকে যেখানে রেখে গিয়েছিলো সে, সেখানে ঘোড়াটাও নাই! তবে? আর ভাবতে পারে না কামার অল? মাথাটা ঝিম ঝিম করে ওঠে।
অনেকক্ষণ কেটে যায়। সম্বিৎ ফিরে আসে। কিন্তু তখনও সে বুঝতে পারে না ব্যাপারটা, সামসের পক্ষে ঘোড়া চেপে অন্য কোথাও চলে যাওয়া কী সম্ভব? না না, সে কী করে হতে পারে। কলের ঘোড়া চালাবার কায়দা কসরৎ না জানলে চালাবে কী করে? এবং-এ পর্যন্ত সামস অল কখনও জানতেও চায়নি, কী ভাবে চালাতে হয়। অন্য কোনও মানুষের পক্ষেও তাই। চালাবার কৌশল একমাত্র সেই পারস্য-পণ্ডিত ছাড়া তো কারোই জানা নাই। তবে কী সে-ই?
চারশো ছাব্বিশতম রজনীতে আবার গল্প শুরু হয় :
—বাগিচায় অন্য কোনও লোককে ঢুকতে দেখেছে? কোন ঝুট বলবে না, তা হলে তোমায় গর্দান যাবে—
ভয়ে থর থর করে কাঁদতে থাকে লোকটা। আল্লাহ কসম, অন্য কাউকেই দেখিনি। শুধু সেই পারসী-পণ্ডিত একবার ঢুকেছিলেন। দু-একটা ফুল তুলেছিলেন নজর করেছি। কিন্তু সে এখনও বাইরে যায়নি। ভিতরেই কোথাও আছে।
এবার আর বিন্দুমাত্র সংশয় থাকে না কামার আল-এর। আর কেউ নয়, সেই শয়তানটাই তার প্রিয়তমাকে উধাও করে নিয়ে পালিয়েছে। দুঃখে বিষাদে সারা দেহ, মন ছেয়ে যায়। এখন সে কী করবে, কী করা উচিত কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। দিশাহারা হয়ে মিছিলের দিকে ছুটে চলে। বাদশাহ সাবুরের সঙ্গে দেখা করে বলে, আব্বাজান, সর্বনাশ হয়েছে! সেই শয়তান পণ্ডিতটা সামস অল নাহারকে নিয়ে পালিয়েছে। মিছিল ফিরিয়ে নিয়ে আপনি প্রাসাদে চলে যান। আমি চললাম, যতদিন না। তাকে খুঁজে পাই, আমি ফিরবো না।
বাদশাহ আতঙ্কিত হয়ে আর্তনাদ করে ওঠে।
—আমার কথা শোন বাবা, প্রাসাদে ফিরে চল। তোমাকে আমি এক ছেড়ে দিতে পারবো না। ফিরে চল, তারপর আমি একটা ব্যবস্থা করছি।
-সে হয় না, বাবা, আমি এর শেষ দেখে নিতে চাই। কত বড় শঠ শয়তান সে, আমি একবার দেখবো।
বাদশাহ বলেন, কিন্তু বাবা, ও যে যাদুকর। তার ভেল্কিবাজীর কাছে তোমার দেহাবল তুচ্ছ। সে তোমাকে মন্ত্রবলে নিমেষে হত্যা করে ফেলবে। তার চেয়ে তুমি প্রাসাদে চল। আমি তোমার জন্য তামাম আরব বাদশাহদের সুন্দরী কন্যা জোগাড় করে আনবো। তার মধ্যে যাকে তোমার পছন্দ হয় তার সঙ্গে শাদী দিয়ে দেব।
কামার আল রুদ্ধকণ্ঠে বলে, এ আপনি কী বলছেন, আব্বাজান! সামস ছাড়া আমি অন্য নারীর চিন্তাও করতে পারবো না। আপনি আমাকে বাধা দেবেন না বাবা, কেউ আমার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে আল্লাহ যখন আমাকে রক্ষা করেছেন আমি আর কাউকেই ডরাই না।
বাদশাহকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে ঘোড়ার পিঠে চাবুক বসায়! তীরবেগে ছুটে বেরিয়ে যায় কামার আল। হাপুস-নয়নে কাঁদতেকাঁদতে ফিরে আসেন বাদশাহ সাকুর।
নিমেষের মধ্যে শোকের কালো ছায়া নেমে আসে। সারা শহরে। প্রাসাদে বিরাজ করতে থাকে কবরের নিস্তব্ধতা।
একেই বলে নিয়তি। সেই পারসী যাদুকর সেইদিন ঘটনাক্রমে বাগিচায় ঢুকেছিলো কিছু ফুল সংগ্রহ করতে। কিন্তু বাগানে ঢুকেই সে বুঝতে পারলো কাছে-পিঠেই এমন কেউ আছে—যার গায়ের অতি মূল্যবান আতরের খুশবু সারা বাগানে ভুর ভুর করছে। পায়ে পায়ে সে বাগিচামহলের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। জানিলা দিয়ে ঘরের পালঙ্ক-শয্যা পরিষ্কার চোখে পড়ে। যাদুকর দেখলো, এক পরমাসুন্দরী রমণী শয্যায় গা এলিয়ে পড়ে আছে। চোখ দুটো বোজা। হয় বা ঘুমিয়ে গেছে, হয়ত নয়; এমনিই চোখ বন্ধ করা অন্তস্থ হয়ে আছে। ওপাশে নজর পড়তেই দেখলো, তার সেই যাদু ঘোড়া-দরজার একপাশে দাঁড় করানো। এবার বুঝতে কষ্ট হলো না, ঘোড়াটা কামার অলই রেখে গেছে। এখানে। এবং এই আলোক-সামান্যাও তারই এক সংগ্বহ।
বুড়ে যাদুকরের চোখ আনন্দে নেচে ওঠে। মাথায় এক বন্দবুদ্ধি খেলে যায়। ঘোড়াটার পাশে গিয়ে সে ভালো করে দেখে নেয়। যন্ত্রপাতিগুলো ঠিক আছে কিনা। তারপর আস্তে আস্তে এসে সামস অল-এর ঘরে ঢুকে আভুমি নত হয়ে সশব্দে লম্বা একটা কুর্ণিশ জানিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
সামস-এর তন্দ্ৰাভাব কেটে যায়। চোখ মেলে। দরজার দিকে এক পলক তাকিয়েই আঁৎকে উঠে আবার সে বন্ধ করে নেয় চোখ দুটো।
—কে তুমি?
–যাদুকর বিগলিত কণ্ঠে বলে, শাহজাদা আপনাকে বলে পাঠিয়েছেন, এই শহরেই অন্য একটা বিলাসমহলে আপনার থাকার ব্যবস্থা করেছেন তিনি।
এখানে আপনার কষ্ট হতে পারে। সেইজন্যে তিনি আরও সুন্দর আরও ভালো একটি বিলাসবহুল প্রাসাদ সাজিয়ে গুছিয়ে ঠিকঠাক করছেন। সেখানে আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন তিনি, মেহেরবানী করে আমার সঙ্গে চলুন আপনি।
সামস অল নাহার বিরক্ত বোধ করে, তা তিনি নিজে না এসে তোমাকে পাঠালেন কেন?
সামস অল বলেই ফেলে…তা আর কোনও লোক পেলেন না। তিনি? তোমার মতো একটা ভয়ঙ্কর জীবকে পাঠিয়েছেন? উফ, তোমার কী বিশ্ৰী চেহারা। দেখলে গা গুলিয়ে যায়!
রাত্রি শেষ হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো।
চারশো সাতাশতম রজনীতে আবার সে বলতে শুরু করে :
—ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি। কিন্তু যাবো কিসে? কী এনেছো?
সামস অল না না করে ওঠে, ওরে বাবা, ও ঘোড়ায় আমি এক চাপতে পারবো না।
যাদুকর হাসে। মনে মনে ভাবে, এবার যাবে কোথায়, বাছাধন। এখন তুমি আমার কোজায়। যেখানে তোমাকে নিয়ে যাবো, সেখানেই যেতে হবে। দাঁড়াও একবার তোমাকে জিনের ওপরে চাপাই আগে, তারপর দেখবে আমার খেল—
-সেজন্যে আপনি কিছু ভয় করবেন না, বেগমসাহেবা, আমি আপনার সঙ্গে চাপবো। তা না চাপলে, এ তো আর জ্যান্ত ঘোড়া নয়, আপনি চালাবেন কী করে?
শো শোঁ করে আকাশের ওপরে প্রায় মেঘের কাছাকাছি উঠে যায় যাদুকর। তারপর আর একটা বোতাম টিপে সে তীরবেগে সামনের দিকে ছুটে চলে। সামস অল দেখে, নিচে শহরের প্রাসাদ ইমারত ছাড়িয়ে ঘোড়াটা ছুটে চলেছে মরুপ্রান্তরের উপর দিয়ে। তারপর এক সময় বিশাল বিস্তৃত মরুভূমিও পার হয়ে যায় ঘোড়াটা। গাছপালা, শ্যামল শস্যক্ষেত্ব, নদী, জনবসতি আসে। নিমেষেই তারা পিছনে পড়ে থাকে। তখন ঘোড়াটা উল্কার বেগে ছুটে চলেছে।
সামস অল নাহার বুঝতে পারে না। এ সে কোথায় চলেছে? লোকটা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? ভয়ার্ত কণ্ঠে সে প্রায় চিৎকার করে ওঠে, একি? এদিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাকে? আমাকে তো শোনালে, শহরের কাছেই যেতে হবে। কিন্তু কত নদী, মরুভূমি ছাড়িয়ে এলাম, এখনও কী দেরি আছে?
—শোনো, সুন্দরী, তুমি যেই হও, এখন থেকে আমার পেয়ারের বাঁদী হয়ে থাকবে। এই আমার শেষ কথা।
একটা নদীর পাড়ে একটা বাগানের পাশে এসে ঘোড়াটা নেমে দাঁড়ায়। যাদুকর বলে, উফ বড় তেষ্টা পেয়েছে। চলো, একটু পানি খাবো।
সামস অল নাহার ঘোড়া থেকে নেমে এসে ঘাসের ওপর লুটিয়ে পড়ে।
—এত বড় শয়তান তুমি, ভুলিয়ে ভালিয়ে আমাকে তোমার আস্তানায় নিয়ে যেতে চাইছো? সে কিছুতেই হবে না।
—আহা-হা, অত চটছো কেন সুন্দরী। তোমাকে আমি তোমার নাগর কামার অল-এর চাইতে আরও বেশি সুখে রাখবো। জানো, আমি কে? তামাম আরব পারস্য দুনিয়ার মানুষ আমার যাদুর কথা জানে। আমি মন্ত্রবলে অসাধ্য-সাধন করতে পারি। আমার প্রাসাদে চলো, দেখবে। বাদশাহ সাবুর সে-প্রাসাদ জিন্দগীতে বানাতে পারবে না। আমি মন্ত্রবলে তৈরি করেছি এক নতুন বেহেস্ত। তুমি হবে তার মালকিন। কত-শত সহস্ব বাঁদী তোমার সেবা যত্ন করবে। যে সুধা পান করলে মানুষ অমর হয়। সেই সুধা আছে আমার কাছে। তোমাকে দেব, তুমি খেয়ে চির-যৌবনা হয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকবে। বলে তোমার নাগর কামার অল পারবে এসব দিতে? পারবে কী করে, বলো? এ বস্তু তো কডি দিয়ে কিনতে পাওয়া যায় না। যাদুবলে সংগ্বহ করেছি আমি। আমার বয়স কত জান? একশো বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু দেখ, আমার শরীরে কী তাকত। হাজার পালোয়ানকে এক লহমায় কুপোকাৎ করে দিতে পারি। ভাবছো, আমি বুড়ো হয়েছি, তোমার যৌবন-কাম ব্যর্থ হয়ে যাবে? তবে জেনে রাখা সুন্দরী, আমি দেখতে কুরূপ হতে পারি, বয়েস আমার একশোরও বেশি হতে পারে, কিন্তু এখুনও আমি তোমার মতো শত সুন্দরীকে সমানভাবে তুষ্ট রাখতে পারি। সুতরাং মন থেকে ওই সব ভালোবাসার প্যানপ্যােনানি মুছে ফেলো। মেয়েরা চায় বিলাস-ব্যাসন, আর চায় রতি-রঙ্গের জাঁদরেল যন্তর। ও দুটো আমার কাছ থেকে যা পাবে, কামার অল এর কাছ থেকে তা কখনই পাবে না। কামার অল একটা লম্পট, চোর। আজ যে মেয়েকে নিয়ে নাচে, কাল তাকে আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে দেয়। এই যে কলের ঘোড়াটা দেখছো, এটার মালিক কে জানো? আমি। সে আমার জিনিস চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলো তোমাকে ভুলিয়ে ভাগিয়ে আনতে।
সামস অল নাহার চিৎকার করে ওঠে, থামো! তোমার অনেক বুজরুকি আমি শুনেছি, আর শুনতে চাই না। এখন জানে বঁচতে চাও তো কেটে পড়। না হলে কপালে তোমার দুঃখ আছে।
যাদুকর হা হা করে হাসিতে ফেটে পড়ে, আমার কপালে দুঃখ জিনিসটা লিখতে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, সুন্দরী। আমি সুখের সাগরে ভেসে বেড়াই। তোমাকেও অবশ্য সঙ্গী করে নেব, ভয় নাই।
এমন সময় দুজন জাঁদরেল সেনাপতি গোছের লোক পিছন দিক থেকে অতর্কিতে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো যাদুকরের ওপর।
—এ্যাই, ওঠ, চলো, শাহেনশাহর কাছে যেতে হবে।
পারস্যের সীমানা ছাড়িয়ে রুমমুলুকে এসে ঘোড়াটাকে নিচে নামিয়েছিলো যাদুকর। উদ্দেশ্য ছিলো খানিকটা জিরিয়ে নিয়ে পানি পান করে আবার আকাশে উড়বে। রুম ছাড়িয়ে, আরও সুদূরে, অন্য কোনও দূরদেশে পাড়ি জমাবে। কিন্তু তা আর হলো না।
কাছেই রুমের শাহেনশাহর শহর। বাদশাহ প্রতিদিন বিকালে মুক্ত বায়ু সেবন করতে আসেন এই নদীর ধারে। সে-দিনও যথারীতি উজির আমির সেনাপতি নবাব বান্দা সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে এসেছেন। হঠাৎ তার কানে ভেসে এল নারী-কণ্ঠের আর্তনাদ। ভালো করে নজর করতে, বুঝতে পারলেন অনেকটা দূরে একখণ্ড সবুজ ঘাসের ওপর বসে আছে একটি পরমাসুন্দরী মেয়ে, আর তার পাশে এক বুড়ো। তরুণীর আর্তকণ্ঠ শুনে তিনি ভাবলেন, নিশ্চয়ই লোকটা কোনও দুবৃত্ত, বদমাইশ। অসহায় অবলাকে জোর করে কোথাও নিয়ে যেতে চাইছে। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সেনাপতিদের বললেন, ঐ লোকটাকে ধরে নিয়ে এসো। বুড়ো যাদুকর ভ্যাবাচ্যাক খেয়ে গেছে। হঠাৎ এখানে কেউ এসে পড়তে পারে, মনে হয়নি।
-এ্যাঁ, আমাকে কেন পাকড়াও করছেন? কী করেছি আমি।
সেনাপতিরা বলে, সে কৈফিয়ৎ শাহেনশাহর কাছেই দেবে, চলো।
কিন্তু তবু যাদুকর নড়তে চায় না। সেনাপতিদ্বয় তার দুই গালে বিরাশিসিক্কার দু’খানা ঘুষি লাগাতেই বাছাধন কঁকিয়ে ওঠে, যাচ্ছি-যাচ্ছি।
বাদশাহ দেখে অবাক হয়, লোকটা কী ভয়ঙ্কর কুৎসিত কদাকার। এমন হত-কুৎসিত মানুষ তিনি জীবনে দেখেননি কখনও। আর এ-রকম অলোক সামান্যা সুন্দরী যুবতীও তিনি কমই দেখেছেন। বাদশাহ সামস অলকে জিজ্ঞেস করে, তোমার বাপ-মা কী নিষ্ঠুর পাষণ্ড। তোমার মতো এক অপূর্ব রূপসী মেল্লয়কে এই কবরের মড়া একটা বুড়োর গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে?
—মিথ্যো কথা, সামস অল নাহার ফুসে ওঠে। একদম ডাহা মিথ্যে কথা, জাঁহাপনা। লোকটা মহা শয়তান, বদমাইশ যাদুকর। আমাকে ভাওতা দিয়ে ভুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও আমি ওকে চিনতাম না। জীবনে কখনও দেখিনি। পারস্যেব শাহজাদা আমার স্বামী। সেখান থেকে ও আমাকে ধাপ্পা দিয়ে বের করে নিয়ে এসেছে।
বাদশাহ বললেন, আমি সবই বুঝতে পেরেছি। ঠিক আছে এখনই দাওয়াই দিচ্ছি।
বাদশাহর হুকুমে সেনাপতিরা বেদম প্রহার করতে থাকলো যাদুকরকে। তাদের এক একটা ঘুষিতে তার হাড় পাঁজর গুড়ো গুড়ো হয়ে যেতে লাগলো। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে থাকে সে। কিন্তু মুখে দোষ স্বীকার করে না।
বাদশাহ বললেন, আচ্ছা এখন ওকে কারাগারে কয়েদ করে রেখে দাও। পরে আবার দেখা যাবে।
সামস অল নাহার এবং সেই আজব কাঠের ঘোড়াটাকে সঙ্গে নিয়ে বাদশাহ প্রাসাদে ফিরে এলেন। বাদশাহ ভেবে অবাক হন এই কাঠের ঘোড়ায় করে তারা এলো কী করে। অদ্ভুত ব্যাপার তো, মাথার মধ্যে শুধু এই একটা চিন্তাই ঘোরাফেরা করতে থাকে।
এবারে বাদশাহজাদা কামার আল আকমরের কথা শুনুন। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলে মরুপ্রান্তর, নদী নালা পাহাড় বন্দর। কত সবুজ ফসলের মাঠ অতিক্রম করে, কত গ্রাম গঞ্জ পিছনে ফেলে বিরাম-বিহীনভাবে ঘোড়া ছুটিয়ে চলতে থাকে সে।
রাত্রির অন্ধকার হাল্কা হতে থাকে। প্রভাত সমাগত দেখে শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
চারশো আটাশতম রাত্রি :
এইভাবে চলতে চলতে একদিন সে সানা-শহরে এসে পড়ে। কামার অল ভেবেছিলো, যদি সামস অল এখানে ফিরে এসে থাকে। কিন্তু সানা-বাসীরা বললো, শাহজাদীর শোকে বাদশা-বেগম শয্যাশায়ী হয়ে আছে। না, তিনি ফিরে আসেন নি। ফিরলে সারা সালতানিয়ৎ আবার আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়বে না?
একদিন, তখন সন্ধ্যা হয় হয়, কামার অল একটা সরাইখানায় এসে থামে। রাতটা সেখানেই সে কাটাবে।–সেইরকম ইচ্ছা। সরাইখানার সামনের ঘরে এক দল সওদাগর গোল হয়ে বসে খানাপিনা আর গল্প-গুজব করছিলো। কামার অল তাদের কাছাকাছি একটা আসনে বসে পড়লো।
সওদাগরদের একজন বলতে থাকে, এক আজব কাহিনী শুনে এলাম। কামার আল কান খাড়া করে শোনে।
সওদাগররা সবাই উৎসকুক হয়ে তাকায়, কী এমন আজব কাহিনী ভাই সাহেব?–আমি রুমের শহরে সওদা বিক্রি করতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিরছি। সেখানকার লোকের মুখে মুখে ফিরছে। শুধু একটাই কথা।
-কী কথা?
সওদাগররা চুপসে গেলো, তারা ভেবেছিলো এমন কথা শোনাবে যে যাতে একেবারে তাক লেগে যায়। সবাই সমস্বরে বললে, এ আর এমন কী ঘটনা।
এমন কাণ্ড আজকাল আকছার হচ্ছে। কত মেয়ে কত মানুষের সঙ্গে ভোগে যাচ্ছে-তা নিয়ে আবার গল্প কী-?
আবার সবাই কৌতূহলী হয়ে তাকায়। সওদাগরটি বলে, ঐ বুড়োটা আর সুন্দরী মেয়েটা নাকি একটা আজব কাঠের ঘোড়ায় চেপে আসমান দিয়ে উড়ে এসে নেমেছিলো। ঘোড়াটা আর মেয়েটিকে বাদশাহ প্রাসাদে রেখে দিয়েছেন। আর বুড়োটাকে রেখেছেন। কয়েদখানায়।
সওদাগরটি অনেক ফুলিয়ে ফাপিয়ে রসিয়ে রসিয়ে নানা রকম রঙিন বর্ণনা সহকারে কাহিনীটা বলতে থাকে। তার বিস্তারিত বিবরণ এ কাহিনীর উদ্দেশ্য নয়।
কামার আল-এর মনে বিন্দুমাত্র সংশয় থাকে না। এতদিন ধরে সে যার সন্ধান করে বেড়াচ্ছে আজ তার হদিস পেয়ে মন চনমান করে ওঠে। গায়ে পড়ে সে সওদাগরটিকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা জনাব, কোন শহরের কথা বললেন?
আর তিলমাত্র অপেক্ষা না করে সে রাতেই সে বেরিয়ে তীরবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে চলতে-চলতে এক-সময় রুম শহরের প্রবেশদ্বারে এসে পৌঁছয়। ফটকের পাহারাদার বিদেশী কামার অলকে দেখে বলে, এখানকার নিয়ম অন্য দেশের কোনও মানুষ এ-শহরে ঢুকতে চাইলে আগে তাকে বাদশাহর দরবারে যেতে হবে। বাদশাহ যদি অনুমতি দেন তবেই সে শহরে ঢুকতে পারে।
কামার আল বলে, বেশ তো আমাকে নিয়ে চলো, তোমাদের বাদশাহর দরবারে।
কিন্তু রাত। তখন অনেক। পাহারাদার বলে, এত রাতে তো বাদশাহর সঙ্গে দেখা হবে না। আজ আপনাকে এখানেই কয়েদখানায় রাত কাটাতে হব।
কিন্তু ফটকের কোতোয়াল কামার অল-এর অদ্ভুত সুন্দর চেহারা দেখে মুগ্ধ হয়ে পড়ে। ভাবে, আহা এমন খুবসুরৎ নওজোয়ান-একে সে কয়েদখানায় ঢোকাবে?
কোতোয়াল হেসে ওঠে, কিছু মনে করবেন না, পারসীদের সম্বন্ধে ধারণা আমাদের খুব খারাপ। শুনেছি তাদের মধ্যে ভালো লোক খুবই কমই আছে। ঠগ, জোচ্চোর, বদমাইশ, শয়তানদের সংখ্যাই নাকি বেশি। এই তো কিছুদিন আগে একটা বুড়ো পারসী এসেছে আমার এই কয়েদখানায়। অনেক পারসীকে দেখেছি, আলাপও করেছি। অনেকের সঙ্গে। নানারকম মিথ্যা আজগুবি কিসসা তারা শোনায়। কিন্তু সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে এই বদখদ বুড়ো কয়েদীটো। লোকটা চোখে মুখে মিথ্যে কথা বলে। এমন ঠগ শয়তান আমি জীবনে দেখিনি কখনও।
কামার অল উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করে, কী রকম? কী ধরনের মিথ্যে কথা সে বলেছে। –লোকটা হামবড়াই। তার ধারণা সে একটা পীর পয়গম্বর। তার মতো ধন্বন্তরী হেকিম নাকি সারা দুনিয়ায় নাই। আমাদের বাদশাহ একদিন শিকারে বেরিয়ে এক জঙ্গলের পাশে এই বুড়োটাকে দেখতে পান। লোকটা এক অপরূপ সুন্দরী যুবতীকে নিয়ে পালাচ্ছিল। ওদের সঙ্গে একটা কাঠের ঘোড়া পাওয়া গেছে। এই কালো কাঠের ঘোড়াটা এক তাজ্জব জিনিস। কাঠের ঘোড়টায় কল বসানো আছে। সেই কল টিপলে নাকি সে আকাশে উঠে ছুটিতে থাকে। প্রাসাদেই রাখা আছে ঘোড়াটা।
কামাল জানতে চায়, আর সেই মেয়েটা?
কামার অল ভাবে, যাক একটা হদিশ পাওয়া গেলো। তখন সে কী ভাবে এগুবে তারই মতলব করতে লাগলো। রাত যখন আরও গম্ভীর হয়ে এলো তখন কোতোয়াল বললো, এবার সাহেব, আপনাকে কয়েদখানার ভিতরে ঢুকতে হবে যে।
কামার আল বলে, আমি তো প্রস্তুত। চলুন, কোথায় নিয়ে যাবেন।
ভিতরে ঢুকেই সে একটা গোঙনী শুনতে পেলো। সেই বুড়ো যাদুকরটা নিজের মনেই বিড়-বিড় করে বকে চলেছে।
—হায় হায় একি সর্বনাশ করলাম আমি। কেন মরতে ঐ নদীর পাশে নামতে গেলাম! আমন সুন্দর কচি ডাগর ছুডিটা রসিয়ে-রাসিয়ে উপভোগ করবো। আশা করেছিলাম—কিন্তু শয়তান বাদশাহটা তা হতে দিলো না। আমার বাড়াভাতে ছাই দিয়ে দিলো! একটুখানি চালের ভুলের জন্য আমার এই সর্বনাশ হয়ে গেলো। উঃ!
বুড়োর কাহিনী শুনতে শুনতে রাত কাবার হয়ে যায়।
এই সময় রাত্রি শেষ হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
চারশো ঊনত্রিশতম রজনী :
বাদশাহ প্রশ্ন করলেন, কী তোমার নাম? কোথা থেকে আসছো? তোমার ব্যবসাই বা কীসের। আমার শহরে কেন ঢুকতে চাও?
বাদশাহ বাহবা দিলেন, বহুত বডিয়া বাত। চমৎকার। তুমি যথা-সময়েই এসে পড়েছে। আমার কাছে। ঠিক এই রকম একজনকেই আমি খুঁজছিলাম, হেকিম।
এরপর বাদশাহ তার বেড়াতে যাওয়ার কাহিনী দিয়ে শুরু করে বৃদ্ধকে কয়েদ করা পর্যন্ত আদ্যোপান্ত সমস্ত কাহিনী সবিস্তারে বললো কামার অলকে। তারপর মেয়েটির মাথার গোলমাল শুরু হলে, কোন হাকিমকে দিয়ে কবে কবে দেখিয়েছিলেন তারও লম্বা ফিরিস্তি।
—এখন তুমি যদি সত্যিই তাকে সারিয়ে তুলতে পোর, তোমার কোনও ইচ্ছাই আমি অপূর্ণ রাখবো না হেকিম। যা চাইবে তাই পাবে। আমার কী মনে হয় জানি, মেয়েটির রূপে পাগল হয়ে কোনও একটা জিন বা আফ্রিদি তার কাধে ভর করে আছে।
কামার আল বলে, আল্লাহর অপার করুণা বর্ষিত হোক; এখন আমাকে রোগের লক্ষণ-গুলো ঠিক ঠিক বলুন তো, জাঁহাপনা। কী কী উপসর্গ তার দেখেছেন? এবং কবে থেকে এরকমটা হচ্ছে।
—হচ্ছে সেই প্রথম দিন থেকেই। যেদিন তাকে আর সেই যাদুকর বুড়োটাকে এবং সেই আবলুস কাঠের ঘোড়াটাকে নিয়ে এলাম সেইদিন থেকেই সে অসুখে পড়ে।
কামার আল জিজ্ঞেস করে, সেই বুড়োটা এখন কোথায়?
—আর সেই ঘোড়াটা?
—তাতো বটেই।
মনে মনে ঠিক করলো, সবকিছু করার আগে আর একবার ঘোড়াটাকে স্বচক্ষে দেখে নিতে হবে। বলা যায় না, বুড়ো শয়তানটা কোনও কারসাজী করে রেখেছে। কিনা। যদি দেখি; ঘোড়াটা ঠিক আছে, তা হলে আমার বাজী মাৎ করতে বেগ পেতে হবে না। কিন্তু ঘোড়াটা যদি কোনক্রমে বিকল হয়ে থাকে, তা হলে সামসকে উদ্ধার করার অন্য উপায় বের করতে হবে। বাদশাহর দিকে ফিরে কামার আল বলে, আগে আমি ঐ ঘোড়াটাকে পরীক্ষা করে দেখতে চাই। হয়তো রোগের আসল কারণ ওর মধ্যেই নিহিত আছে।
বাদশাহ বললেন, বেশ তো, এ আর এমন কি কথা, এখুনি দেখিয়ে দিচ্ছি।
কামার অলকে সঙ্গে নিয়ে বাদশাহ খাজাঞ্চীখানায় চলে আসেন। কামার অল এক এক করে সব বোতাম যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে দেখে নেয়। না, ঠিক আছে। কামার আল খুশিতে নেচে ওঠে।
—আমার মনে হচ্ছে এই ঘোড়া থেকেই তার রোগের সংক্রমণ ঘটেছে। যাক, এবার আমি রুগীকে দেখবো! আমার বিশ্বাস, রোগ আমি ধরতে পেরেছি। দাওয়াই আমি নিজে হাতেই বানাবো। কিন্তু তার জন্যে রুগীর সঙ্গে এই ঘোড়াটাকে দরকার হতে পারে জাঁহাপনা।
বাদশাহ কামার অলকে নিয়ে সামস অল নাহারের শয্যাকক্ষে আসেন। সামস অল, কামার অলকে লক্ষ্য করে, তাদের দেখামাত্র তার পরণের সাজ-পোশাক ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করতে থাকলো। কখনও বা হা হা হি হি করে হাসতে লাগল, আলুথালু চুল, অসংবৃত বেশবাস। কখনও সে হাততালি দেয়, গান গায়। আবার কখনও বা কপাল বুক চাপড়াতে থাকে।
কামার আল বুঝলো, এ-সবই তার চালাকী। কী করে সুলতানকে সেখান থেকে সরানো যায় তারই কায়দা খুঁজতে থাকে সে।
কামার আল সামসের কাছে এগিয়ে যায়। খুব ধীরে ধীরে বলে, দিন দুনিয়ার মালিক যিনি তারই দোয়ায় আপনার সব রোগ সেরে যাবে।
কামার অল-এর কথা শেষ হতেই সামস তার মুখের দিকে ফিরে তাকায়। বুকের মধ্যে এক অসহ্য আনন্দের জোয়ার ঠেলে উঠতে চায়, কিন্তু মুখে প্রকাশ করতে পারে না। হঠাৎ একটা আর্তনাদ করে মেজেয় লুটিয়ে পড়ে যায়।
বাদশাহ ভাবলেন, হেকিম বন্দ্যিদের সম্বন্ধে একটা আতঙ্ক হয়ে গেছে তার। কোনও মানুষকেই সে বরদাস্ত করতে পারে না, বিশেষ করে হেকিমদের একেবারে না। কামার আল সামস অলকে ওঠাবার চেষ্টা করে। কনের কাছে ফিসফিস করে বলে, সামস অল নাহার, আমার চোখের মণি, সোনা, ওঠে, এইভাবে জীবনটাকে বরবাদ করে দিও না। আমার দিকে চোখ মেলে তাকাও; দেখ, আমি এসেছি। আর তোমার ভাবনা কী। এতদিন কষ্ট করে আছ, আর দু একটা দিন কষ্ট করে কাটাও, আমি তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবোই, সোনা। এখন খুব সাবধানে—সতর্কভাবে চলতে হবে। আমাদের। কেউ যেন ঘৃণাক্ষয়েও কোন রকম সন্দেহ না করে। অনেক ধৈর্য ধরে মাথা ঠাণ্ডা করে কাজ হাসিল করতে হবে। চালে একটু ভুল হলেই সব মাটি হয়ে যাবে। তা হলে আমি আর জান নিয়ে ফিরতে পারবো না। যদি আমরা এই নারী-মাংসলোভী অত্যাচারী বাদশাহর মনে একবার গভীর আস্থা এনে দিতে পারি, তা হলে কাজটা অনেক সহজ হয়ে উঠবে। এজন্যে তোমার সাহায্য সবচেয়ে বেশি দরকার। বাদশাহ পাশের ঘরেই বসে আছেন, আমি তাকে গিয়ে বলছি তোমাকে জিনে ধরেছে। সেই কারণেই তোমার মধ্যে একটা উন্মাদের ভাব দেখা গেছে। এবং এও তাকে আমি আশ্বাস দেবো, আমার চিকিৎসায় থাকলে ও নির্ঘাৎ সেরে যাবে। তুমিও-এরপর যখন বাদশাহর সঙ্গে কথা বলবে, অপেক্ষাকৃত একটু শান্তভাবে, সাধারণ সুস্থ মানুষের মতো বলবে। এর ফলে বাদশাহ ভাববেন আমার চিকিৎসাতে অনেকটা ফল হয়েছে।
সামস অল নাহার মৃদু হেসে বলে, ঠিক আছে, দেখো কেমন পাকা অভিনয় করি। এতদিন যে পাগলী সেজে ছিলাম, কেউ কি এক বিন্দু সন্দেহ করতে পেরেছে?
বাদশাহ অবাক হয়, বলো কী হেকিম? তোমার ওষুধের এত গুণ?
আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে বাদশাহ পাশের ঘরে ঢোকেন। বাদশাহকে দেখা মাত্র সামস আল নাহার যথাবিহিত কুর্নিশ জানিয়ে সাদর অভ্যর্থনা জানায়।
—বাদীকে যে এই অসময়ে স্মরণ করেছেন, এ জন্য আমি ধন্য হলাম, জাঁহাপনা। রাত্রির অন্ধকার কাটে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
চারশো তিরিশতম রজনী :
দাসী বাঁদী এসে কুর্নিশ করে দাঁড়ায়। সামসও তাদের কথার যথারীতি জবাব দেয়। ওরা ওকে হামামে নিয়ে গিয়ে গোসল করিয়ে সুন্দর করে পরীর সাজে সাজায়। সত্যিই রুপের তুলনা মেলা ভার। বেহেস্তের ডানাকাটা পরীই বটে!
—তোমাকে কী বলে সম্বোধন করবো বুঝতে পারছি না হেকিম। তুমি সামান্য এক চিকিৎসক নও, তোমার ভিতরে যে অলৌকিক ক্ষমতা আছে তা কেবলমাত্র পীর পয়গম্বরদেরই থাকতে পারে। তুমি এক বিরাট দার্শনিক-একথা বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না। অনেকদিন পরে আজ আমার এবং তার মুখে যে হাসি ফুটে উঠেছে সে তো শুধু তোমারই কল্যাণে। আল্লাহ তোমাকে চিরায়ু করে রাখুন। দুনিয়ার অনেক মানুষের দুঃখ মোচন করতে পারবে তুমি।
শাহজাদীকে সঙ্গে নিয়ে আপনি আজই কোনও স্বাস্থ্যকর মনোরম পরিবেশে চলুন। সেখানেই আমি চিকিৎসার শেষ পর্ব শুরু করবো। ঐ কাঠের ঘোড়াটাকে সঙ্গে নিতে হবে। ওটা আসলে কিন্তু কাঠের ঘোড়া নয়, রোগের আসল উৎপত্তিই ওখানে। ওই হচ্ছে জীনের বাহন। এ অবস্থায় এখানে এই প্রাসাদে থেকে ঐ জীনকে একে বারে তাড়ানো শক্ত হবে। আপাততঃ সে হয়তো শাহজাদীকে ছেড়ে প্রাসাদের কোনও কক্ষে লুকিয়ে থাকবে। তারপর আমি ফিরে এলেই আবার এসে ভর করবে তার ওপর। সেই কারণে আমার পরামর্শ, ঘোড়াটাকেও সঙ্গে নিতে হবে। ফাঁকা জায়গায় তাকে আমি কাজায় আনতে পারবো। হয়তো কিছু সময় লাগবে, কিন্তু আমি যখন তাকে পুরোপুরি হাতের মুঠোয় আনতে পারবো। তখনই তাকে জালার মধ্যে পুরে দরিয়ার জলে ফেলে দেবো।
রুম অধিপতি সেইদিনই রওনা হয়ে গেলেন। অনেক লোকলিস্কর দাসদাসী সঙ্গে নিলেন। কামার অল-এর কথামতো কাঠের ঘোড়াটাও বয়ে নিয়ে চললো বাহকরা।
এক পাহাড়ের পাদদেশে মনোরম পরিবেশে তাঁবু ফেলা হলো। কামার অল বাদশাহকে বললো, কাল সকালে আমি শাহজাদীকে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ায় চাপবো। জীনের সঙ্গে তখনই হবে আমার বোঝাপড়া। সে আমাকে খতম করার কায়দা করবে। কিন্তু আমাকে ঘায়েল করার সাধ্য জীনের হবে না। প্রথমে খুব দাপাদাপি করবে, কিন্তু আমি তাকে এমন ভাবে আকড়ে ধরবো, কিছুতেই পালাতে পারবে না। একটা কথা, জাঁহাপনা, আপনি বা আপনার সৈন্যসামন্ত, লোকজন কেউ যেন ওই জীনের নজরবন্দীর আওতায় যাবেন না। তা হলে সে হয়তো তখন শাহজাদীকে ছেড়ে আপনার অথবা অন্য কাউকে ভর করতে পারে। আমি যখন ওকে পুরোপুরি ভাবে কাজায় আনতে পারবো, তখন আপনাকে কাছে ডাকবো। তার আগে—আপনারা অনেকটা দূরে দূরে থাকবেন।
বাদশাহ বললো, কতটা দূরে কোথায় আমরা থাকবো, তুমি বলে দেবে। তার এক পা এদিক ওদিক যাবো না কেউ।
পরদিন সকালে তাঁবু থেকে ক্রোশখানেক দূরে কাঠের ঘোড়াটাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। কামার অল একটা জায়গা দেখিয়ে বাদশাহকে বললো, আপনি এইখানে অপেক্ষা করুন, জাঁহাপনা। আপনার সৈন্যসামন্ত লোকজনদের বলুন, তারা যেন এখান থেকে সামনের দিকে এগিয়ে না যায়। আমি শাহজাদীকে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়াটার কাছে যাচ্ছি। শাহজাদীকে দেখে জীনটা হয়তো খানিকটা বেগড়বাই করতে পারে। হয়তো সে ছুটে এসে আপনার সেনাদেরও ঘায়েল করার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু তাতে ভয় পাওয়ার কিছুই নাই। আমি ওকে সামলে 0न्म<!
অনেক দূরে একটা ফাঁকা প্ৰান্তরে ঘোড়াটাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। কামার আল আর শাহজাদী হাঁটতে হাঁটতে একসময় তার কাছে এসে দাঁড়ালো। কামার অল দেখে নিলো, সেখান থেকে বাদশাহ আর তার সৈন্যবাহিনীকে দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে নজর করলে তবে বোঝা যায় অনেক দূরে একদল মানুষ নিশাচল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। কামার অল প্রথমে সামস আলকে ঘোড়ার পিঠে উঠিয়ে দিলো, তারপর নিজে লাফিয়ে উঠে তার সামনে বসলো।
—সামস অল, আমার বগলের নিচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে আমার কঁধ দু’খানা বেশ শক্ত করে আকড়ে ধরে থাকে। আমি এক্ষুনি বোতাম টিপবো।
সামস বলে, ঠিক আছে, তুমি চালাও।
তৎক্ষণাৎ ঘোড়াটা একবার নড়ে চড়ে ওঠে। তারপর শো শো করে আকাশের দিকে উঠে যেতে থাকে।
বাদশাহ দূর থেকে আবছাভাবে দেখতে পাচ্ছিল, ঘোড়াটা শূন্যে উঠে যাচ্ছে। তখনও তার মনে অণুমাত্র সন্দেহ জাগেনি। হেকিমের ওপর অগাধ বিশ্বাস এবং আস্থা তার। তিনি ভাবলেন, জীন হয়তো তাকে ঘায়েল করার কসরৎ করছে। কিন্তু সে তো পারবে না, এখুনি হেকিম তাকে শায়েস্তা করে ফেলবে।
ঘোড়াটা ততক্ষণে মহাশূন্যে সুদুর নীলিমায় বিলীন হয়ে গেছে। আর কিছুই দেখা যায় না। তখনও বাদশাহ ভাবলেন, হেকিম নিশ্চয়ই এখনই তাকে আবার মাটিতে এনে ফেলবে।
প্রধান সেনাপতি বললো, কিন্তু ফেরার তো কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, জাঁহাপনা!
কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর এবং দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো, তখনও ঘোড়াটা ফিরে এলো না দেখে বাদশাহ চিন্তিত হলেন।
—তাইতো, ব্যাপারটা সুবিধের মনে হচ্ছে না!
বাদশাহ আৎিকে উঠলেন, এ্যা, বলো কী? এখন কী করা যায়।
সেনাপতি বলে, এখন হা-হুতাশ ছাড়া করার আর কিছুই নাই, জাঁহাপনা। পাখী পালিয়েছে।
বাদশাহ ক্ৰোধে কাঁপতে লাগলেন। তাঁর মনে হলো, এ সবই সেই কদাকার বুড়োটার কারসাজী। গর্জে উঠলেন তিনি, ওই শয়তানটাকে পাকড়াও করে নিয়ে এসো আমার সামনে।
তখুনি বাদশাহ প্রাসাদে ফিরে গেলেন। বুড়ো যাদুকরকে হাজির করা হলো সেখানে। বাদশাহ হুঙ্কার ছাড়লেন, এ্যাই ব্যাটা বাঁদর, বল, কেন তুই আমার কাছে গোপন করে রেখেছিস-ঘোড়াটা আসলে একটা জীন? হায় হায়, হেকিমটা শাহজাদীকে সারিয়ে তুললো, কিন্তু তা আর আমার কপালে জুটলো না। না-জানি ওদের কী হলো? আমার অতগুলো মহা মূল্যবান রত্নালঙ্কার পরিয়েছিলাম শাহজাদীকে—সবই খোয়া গেলো। শুধু তোর জন্য? আমি তোর গর্দান নেব, শয়তান। সেই তোর উপযুক্ত সাজা।
বাদশাহর হুকুমে তখুনি ঘাতকের খাড়ার ঘায়ে পারসী যাদুকরের ধড় মুণ্ডু আলাদা হয়ে লুটিয়ে পড়লো মাটিতে।
এবার কামার আল আর সামস অল-এর কথা শুনুন : বোতাম টিপতেই নিমেষে ঘোড়াটা আকাশের ওপরে উঠে গেলো! কামার আল আর একটা বোতাম টিপে তীরবেগে চলে এলো পারস্যে তার নিজের শহরের উপরে। তারপর নেমে পড়লো তার প্রাসাদের ছাদে।
পুত্রকে আবার ফিরে পেয়ে বাদশাহ সব শোক তাপ ভুলে গেলেন। আবার প্রাসাদ ভরে উঠলো হাসি আর গানে। সানার শাহজাদী সামস অল নাহারকে সাদরে তিনি বরণ করে নিলেন। খানা-পিনা দান-ধানের মহোৎসব আরম্ভ হয়ে গেলো।
ভবিষ্যতে আর যাতে মনের শান্তি ব্যাহত না হতে পারে সেজন্য বাদশাহ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে হুকুম দিয়ে সেই আবলুস কাঠের কালো ঘোড়াটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। তার কলকন্তুজা যন্ত্রপাতি সব দরিয়ায় জলে ফেলে দেওয়া হলো। প্রভাত আগত দেখে শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো।
চারশো বত্রিশতম রজনীতে আবার সে শুরু করলো :
সানার সুলতান কন্যার খবর পেয়ে আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে উঠলেন। কামার আল-এর পাঠানো উপহার সামগ্ৰী গ্রহণ করে জামাতাকেও অনুরূপ উপহার পাঠিয়ে দিলেন তিনি।
কামার অল-এর মনে আশঙ্কা ছিলো, হয়তো সামস অলের বাবা তাকে ক্ষমার চোখে দেখবেন না। হয়তো তিনি তার উপহার প্রত্যাখ্যান করে ফেরৎ পাঠাবেন। কিন্তু দূত যখন ফিরে বললো, তিনি খুব খুশি হয়েছেন তখন কামার অল এবং সামস-এর মন আনন্দে নেচে উঠলো।
সেই থেকে যতদিন সানার সুলতান জীবিত ছিলেন ফি বছর নানা নতুন নতুন উপহার উপটৌকন পাঠিয়েছিলো কামার আল। তার বাবা বাদশাহ একদিন দেহ রাখলেন। কামার অল সারা পারস্য মুলুকের শাহেনশাহ হলো। সানার নতুন সুলতানের সঙ্গে ছোট বোনের শাদী দিয়ে দিয়েছিলেন কামার আল আকমর।
কামার অল-এর আসনকালে প্রজারা সুখে স্বচ্ছেন্দে দিন কাটিয়েছিলো। তার ন্যায় বিচার এবং সুশাসন প্রজাদের মনোরঞ্জন করতে পেরেছিলো। বাদশাহ কামার অলকে তারা প্ৰাণাধিক ভালোবেসেছিলো। এইভাবে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বিপুল গৌরবে স্বদেশ রক্ষা এবং প্রজোপালন করে সময় কালে সে দেহ রক্ষা করেছিলো। তার প্রাণাধিক প্রিয় বেগম সামস আল নাহারেরও ইন্তেকাল হলে, তার মরদেহও কামার আল আকমরের সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়েছিলো।
শাহেন শাহ কামার আল আকমরের গুণগাথা আজও মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। মহৎ মানুষের কখনই বিনাশ হয় না। মরেও সে মানুষের অন্তরে অমর হয়ে থাকে।
বললো, দারুণ কিসসা শোনালে শাহরাজাদ! কালো কাঠের অদ্ভুত ঐ ঘোড়াটাকে আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। জানতে ইচ্ছে করে, কীভাবে তৈরি করা হয়েছিলো তাকে। আজকের দিনে কী এমন কোনও কারিগর নাই, যে তৈরি করে দিতে পারে ঐ রকম একটা উড়ন্ত-যান।
শাহরাজাদ বলে, ঘোড়াটা যদি না ভেঙ্গে দিতেন বাদশাহ সাবুর তা হলে আমার মনে হয়, আজকের মানুষ ওটা দেখে আরও অনেক উড়ন্ত ঘোড়া তৈরি করতে পারতো। কিন্তু তার আর ऊाश्वो नाट्ने।
হতাশ কণ্ঠে শাহরিয়ার বলে, ঘোড়াটা যখন বাদশাহ সাবুর ভেঙ্গে চুরমার করে দিলেন, বড় আঘাত পেয়েছিলাম মনে। সেই থেকে বড় খারাপ লাগছে।
শাহরাজাদ বলে, আপনার খোস-মেজাজ যাতে আবার ফিরে আসে তার জন্যে এবারে একটা অন্য ধরনের মজার কিসসা শুনুন, জাঁহাপনা। এ কাহিনী শুনতে শুনতে এমনি নেশায় মশগুল হয়ে যাবেন আপনি যে, মনে আর কোনও আক্ষেপ হতাশা থাকবে না।
ডিলাইলাহ নামে এক ধূর্ত বুড়ি আর জাইনাব নামে এক মেয়েছেলের ঠগের কাহিনী। শাহরিয়ার বলে, বলো বলো, শুনি। এই সব কিসা শুনতে আমার দারুণ মজা লাগে।
⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN
🔗 MY OTHERS CHANNELS
🔗 FOLLOW ME
Facebook: facebook.com/molakat
Facebook: facebook.com/afsarnizam
Instagram: instagram.com/molakat
Instagram: instagram.com/afsarnizam
Twitter: twitter.com/afsarnizam
🔗 MY WEBSITE
🔗 CALL ME
+8801819515141
🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com
#উপন্যাস
#অনুবাদ
#মোলাকাত
#মোলাকাত
#Molakat
#Novel
#Translation
#BanglaLiterature
#Literature
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#বাংলাসাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#আলিফ_লায়লা
#সাহিত্য

No comments