বিষাদ সিন্ধু : মীর মশাররফ হোসেন_উদ্ধার পর্ব : ৬৪তম প্রবাহ


 
মা­­বের ভা­গ্য­বি­মা­নে দু­­খময় কা­­মেঘ দে­খা দি­লে, সে দি­কে কা­হা­রো দৃ­ষ্টি পড়ে না, ভ্র­মেও কেহ ফি­রিয়া দে­খে না। ভাল মু­খে দু'টি ভাল কথা বলিয়া তা­হার তা­পিত প্রাণ শী­তল করা দূরে থা­কুক, মুখ ফু­টিয়া কথা কহি­তেও ঘৃ­ণা জন্মে, সে দি­কে চক্ষু তু­লিয়া চা­হি­তেও অপ­মান জ্ঞান হয়। সে উপ­যা­চক হইয়া মি­শি­তে আসি­লেও না­না কৌ­­লে তাড়াই­তে ইচ্ছা করে। আত্মীয়-স্ব­জন, পরি­জন জ্ঞা­তি কু­টু­ম্বের চক্ষেও দু­র্ভা­গার আকৃ­তি চক্ষুশূল বোধ হয়। এক­প্রাণ, একআ­ত্মা, হৃদয়ের বন্ধুও সে সময় সহ­স্র দোষ দে­কাইয়া ক্র­মে সরি­তে থা­কেন। দু­­খের সময় জী­বন কা­হার না ভা­­বোধ হয়? শনি-গ্র­স্ত জী­বের কো­থায় না অনা­দর? রা­হু-গ্র­স্ত বি­ধুর অপ­বা­দই বা কত? ভবের ভাব বড়ই চমৎকার। কা­লে আবার সেই আকা­শে,-সেই মা­­বের ভা­গ্য আকা­শে, মৃ­দু মৃ­দু ভা­বে সু­বা­তাস বহিয়া কাল মে­­গু­লি ক্র­মে সরাইয়া সৌ­ভা­গ্য-শশীর পু­­রুদয় হই­লে, আর কথা নাই। কত হৃদয় হই­তে প্রেম, প্রণয়, ভা­­বা­সা, আদর, স্নেহ, যত্ন এবং মায়ার স্রোত প্র­বাহ ধা­রা,-যা­হা বল ছু­টি­তে থা­কে, বহি­তে থা­কে। কত মনে দয়ার সঞ্চার, মি­­নের বা­­না এবং ভক্তির উদয় হই­তে থা­কে। কত চক্ষু সর­লে, বঙ্কি­মে, দে­খি­তে ইচ্ছা করে। কত মু­খে সু­যশ সু­খ্যা­তি গা­হি­তে ইচ্ছা করে, শত­মু­খে সু­কী­র্তির গুণ বর্ণিত হই­তে থা­কে। আর যা­চিয়া প্রেম বাড়াই­তে হয় না, ডা­কিয়াও কা­ছে বসা­­তে হয় না। পরিচয় না থা­কি­লেও পরিচয়ের পরিচয় দিয়া, দা­পিয়া চা­পিয়া বসিয়া থা­কে। আজ এজি­দের ভা­গ্য-বি­মান হই­তে কা­­মেঘ সরিয়া সৌ­ভা­গ্য-শশীর উদয় হইয়াছে-ওমর আলী বন্দি। শত শত ঘো­­ণা দিয়া, দ্বি­গুণ বে­­নের আশা দে­খাইয়াও আশার অনুরূপ সৈন্য­সং­গ্রহ করি­তে সক্ষম হয় নাই। ওমর আলী বন্দি, শূলদ­ণ্ডে তাঁহার প্রা­­­ধের ঘো­­ণা শু­নিয়া দলে দলে সৈন্য­­লে নাম লি­খা­­তে­ছে; স্বা­র্থের আশায়, অর্থের লা­­সায়, কত লোক বি­না বে­­নে এজি­­­ক্ষে মি­শি­তে­ছে। অপ­রি­চিত বি­দে­শী বো­ধে যা­হা­দি­­কে গ্র­হণ করি­তে মারওয়ানের অমত হই­তে­ছে, তা­হা­দের কেহ কেহ স্ব স্ব গুণ দে­খাইয়া, কে­­বা, বা­হু­­লের পরিচয় দিয়া সৈন্য­শ্রে­ণী­তে প্র­বেশ করি­তে­ছে। কে­­বা কোন সৈন্যা­ধ্য­ক্ষ­কে অর্থে বশীভূত করিয়া তা­হার উপ­রো­ধে প্র­বে­­পথ পরি­ষ্কার করিয়া লই­তে­ছে। সক­লেই যে সম­­ক্ষে­ত্রে শত্রুর সম্মু­খীন হই­বে তা­হা নহে। জয়ের ভাগ, যশের অংশ গ্র­হণ করাই অনে­কের অন্ত­রের নিগূঢ় আশা। আজ ওমর আলীর জী­বন শেষ, কাল হা­নি­ফার পর­মায়ু শেষ, যু­দ্ধের শেষ-এই বি­শেষ তত্ত্বেই স্ব­দে­শী বি­দে­শী বহু­লো­কের সৈন্য­­লে প্র­বেশ। আবার ইহাও অনে­কের মনে,-যদি বি­পদ সম্ভব বি­বে­­না হয়, পরাজয়ের লক্ষণ দে­খা যায়, তবে ভবের ভাব, প্র­কৃ­তির স্ব­ভাব, সময়ের তাৎপর্য দে­খাইয়া ক্র­মে সরি­তে থা­কিব। কি­ন্তু জয়ের সম্ভা­­নাই অধিক। ওমর আলীর প্রা­­বধ-হা­নি­ফার দক্ষিণ বা­হু ভগ্ম, একই কথা। একা হা­নি­ফার এক হস্তে কি করি­বে? জয়ের আশাই অধিক। এজি­দের ভা­গ্য­বি­মা­নে সু­বায়ু প্র­তি­ঘা­তে কা­­মে­ঘের অন্ত­র্ধান অতি নি­কট। এজি­দ্-শি­বি­রের চতু­ষ্পা­র্শ্বে বি­ষম জন­তা-সক­লের দৃ­ষ্টিই শূলদ­ণ্ডের সূক্ষ্ম অগ্র­ভা­গে
ওদি­কে মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফার প্রাণ ওষ্ঠা­গত, বন্ধু­বা­ন্ধব আত্মীয়স্ব­­নের কণ্ঠ শু­ষ্ক, সৈনিক দলে মহা আন্দো­লন। "হায়! হায়! এমন বীর বি­পা­কে মা­রা পড়িল! ভ্রা­তৃ-আজ্ঞা প্র­তি­পা­লন করি­তে অকাল কা­লের হস্তে নি­­তিত হইল! কি সর্ব­নাশ! এজি­দের প্র­তি অস্ত্র নি­ক্ষেপ করিও না, এই কথা­তেই আজ ওমর আলী কি­শোর বয়সে শত্রু­­স্তে শূলে বি­দ্ধ হই­তে চলিল! ধন্য রে ভ্রা­তৃ­­ক্তি! ধন্য রে স্থির প্র­তি­জ্ঞা! ধন্য আজ্ঞা পা­লন!ধন্য ওমর আলী!"
সম­­ক্ষে­ত্রে প্র­বেশ করিয়া সৈন্য সং­গ্রহ করা বড় বি­ষম ব্যা­পার। বি­­­কা­লেই দূরদ­র্শি­তার পরিচয়, ভবি­ষ্যৎ জ্ঞা­নের পরিচয়ের পরী­ক্ষা হয়। সু­খের সময় দু­শ্চি­ন্তা, ভবি­ষ্যৎ ভা­­না, প্রায় কোন মস্ত­কই বহন করি­তে ইচ্ছা করে না
মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফা শু­ধু আক্ষেপ করিয়া ক্ষা­ন্ত হন নাই! গা­জী রহ­মানও কে­বল বি­লাপ বা­ক্য শু­নিয়াই নি­শ্চি­ন্ত হন নাই। তাঁহা­দের মস্তি­ষ্ক­সি­ন্ধু আজ বি­শে­ষরূপে আলোড়িত হইয়াছে। সহ­সা এজি­দ্ শি­বির আক্র­মণ করি­বেন না অথচ ওমর আলী­কে উদ্ধার করি­বার আশা অন্ত­রের এক কো­ণে বি­শেষ গো­­­ভা­বে রহিয়াছে। বি­না বে­­নের চা­­রে গৃ­­কা­র্যের সু­বি­ধা নাই, তা­হা­তে আবার যু­দ্ধ­কা­ণ্ডে! অবৈতনিক সৈন্য কি ভয়ানক কথা। কি সা­­ঘা­তিক ভ্রম! ভ্রম কা­হার?
এজি­দ্ বস্ত্র­­ণ্ড­পে দর­বার আহ্বান করিয়া, স্ব­র্ণময় আস­নে মহা­­র্বি­­ভা­বে বসিয়াছে। রা­­মু­কুট শি­রে শো­ভা পা­­তে­ছে। মন্ত্রী­প্র­বর মারওয়ান দক্ষি­­পা­র্শ্বে দণ্ডায়মান। সৈন্য­শ্রে­ণী দর­বা­­সী­মা ঘি­রিয়া গায় গায় মি­শিয়া, অসি হস্তে খাড়া হইয়াছে। পঞ্চ­বি­­­তি রথী নি­ষ্কো­ষিত কৃ­পণ হস্তে ঘি­রিয়া বন্ধ­­­শায় ওমর আলী­কে দর­বা­রে উপ­স্থিত করিল
মারওয়ান ওমর আলী­কে বলিল, "ওমর আলী! তু­মি যে বন্দি, সে কথা তো­মার জ্ঞান আছে?"
ওমর আলী বলি­লেন, "এই­ক্ষ­ণে তো­মা­দের হস্তে বন্দি-সে কথা আমার বেশ জ্ঞান আছে।"
"বন্দির এত অহ­ঙ্কার কেন? নত­শি­রে যোড়করে রাজ সমী­পে দণ্ডায়মান হওয়া কি তো­মার সময়ে উচিত নহে? রা­জা­কে অভি­বা­দন করা কি অব­স্থায় কর্ত­ব্য নহে? মুহূর্ত পরে তো­মার কি দশা ঘটি­বে তা­হা কি তু­মি মনে কর না?"
"আমি সক­লই মনে করি­তে­ছি। তো­মা­দের যা­হা ইচ্ছা হয় কর, অন­র্থক বা­ক্বি­­ণ্ডায় প্রয়োজন নাই। আমি কো­নরূপ অনু­গ্র­হের প্র­ত্যা­শা করি না যে, নত­শি­রে ন্যূনতা স্বী­কা­রে দর­বা­রে খাড়া হইব!"
"সা­­ধান! সর্তক হইয়া জি­হ্বা চা­­না করিও। নম্র­ভা­বে কথা কহা কি তো­মা­দের কা­হা­রো অভ্যাস নাই? রাজ-দর­বার-সমর-প্রা­ঙ্গণ নহে।"
"আমি প্র­­মেই তো­মা­কে বলিয়াছি, বা­ক্বি­­ণ্ডার প্রয়োজন নাই। আমা­কে জ্বা­লা­তন করিও না!আমি তো­মার সহিত কথা কহি­তে ইচ্ছা করি না।"
এজি­দ্ হা­সিয়া বলিল, "আচ্ছা আমার সহিত কথা বল।"
ওমর আলী বলি­লেন, "তু­মিই এমন পবি­ত্র শরীর ভব­ধা­মে অধি­ষ্ঠান করিয়াছ যে, নি­জের গৌ­রব নি­জেই প্র­কাশ করি­তেছ। তো­মার সহিত কথা বলি­লে কি আমার গৌ­রব বৃ­দ্ধি হই­বে?"
"গৌ­রব বৃ­দ্ধি হউক বা না হউক, অতি অল্প সময়ও যদি জগ­তের মুখ দে­খি­তে পাওয়া যায় তা­হা­তে ক্ষ­তি কি? তু­মি আমার বশ্য­তা স্বী­কার কর, প্র­ভু বলিয়া মা­ন্য কর, আমি তো­মা­কে প্রা­­­ণ্ড হই­তে মু­ক্ত করি­তে­ছি।"
"কি ঘৃ­ণা! কি লজ্জা! এজি­দের নি­কট ক্ষ­মা প্রা­র্থ­না! এজি­দের আশ্রয় গ্র­হণ! মা­রিয়ার পু­ত্রের বশ্য­তা স্বী­কার! ছি ছি, তু­মি আমার প্র­ভু হই­তে ইচ্ছা কর? তো­মার বং­শা­­লীর কথা, তো­মার পি­তার কথা এক­বার মনে কর। ছি! ছি! বড় ঘৃ­ণার কণা! এজি­দ্, এত আশা তো­মার-তু­মি আবার মহা­রাজ!"
এজি­দ্ রো­ষে অধীর হইয়া বলিল, "তো­মার গর্দান লই­তে পা­রি, তো­মা­কে খণ্ড খণ্ড করিয়া শৃ­গাল কু­কু­রের উদ­­স্থ করি­তে পা­রি। তু­মি আমার নি­কট প্রা­র্থ­না জা­নাও যে, 'মহা­রাজ! মহা­­ষ্টে যেন আমা­কে বধ করা না হয়'"
ওমর আলী ক্রো­ধে বলি­লেন, "ধি­ক্ তো­মার কথায়! আর শতা­ধি­ক্ আমার জী­­নে! সহ­জে প্রাণ বধ করা হয় ইহাই আমার প্রা­র্থ­না! তো­মার যা­হা করি­বার ক্ষ­­তা থা­কে কর, আমি প্র­স্তুত আছি।"
"মর­ণের পূর্বে যে লো­কে বি­কা­­গ্র­স্ত হয়, কথা সত্য! তো­মার কপাল নি­তা­ন্ত মন্দ, আমি কি করিব?"
"তু­মি আর কি করি­বে? যা­হা করি­বে তা­হার দ্বি­গুণ ফল ভোগ করি­বে।"
এজি­দ্ সক্রো­ধে বলিল, "মারওয়ান, ইহার কথা আমার সহ্য হয় না! প্র­কা­শ্য স্থা­নে যা­হা­তে সর্ব­সা­ধা­­ণে দে­খি­তে পায়, বি­­ক্ষ­গণ দে­খি­তে পায়, এমন স্থা­নে শূলে চড়াইয়া এখ­নই ইহার প্রা­­বধ কর। কা­র্য­শে­ষে আমা­কে সং­বাদ দিও!"
ওমর আলী বলি­লেন, "কা­র্য শেষ করি­লে তো­মা­কে আর সং­বাদ শু­নি­তে হই­বে না। তো­মা­রই সং­বাদ অনে­কে শু­নি­বে।"
মহা­ক্রো­ধে এজি­দ্ বলিল, "আর সহ্য হয় না। মারওয়ান! শী­ঘ্র ইহা­কে শূলে চড়াও।" মারওয়ান নত­শি­রে সম্ভা­ষণ করিয়া বন্দি­সহ দর­বার হই­তে বহি­র্গত হইল
শি­বি­রের বা­হি­রে লো­কে লো­কা­­ণ্য। নি­র্দি­ষ্ট বধ্যভূমি­তে বন্দি­সহ গমন করা বড়ই কঠিন।মারওয়ান শি­বি­রের দ্বা­রে দণ্ডায়মান হইয়া চি­ন্তা করি­তে লা­গিল, 'দর্শ­­­ণের মনে কোন প্র­কার কষ্ট না হয়, রা­জা­জ্ঞাও প্র­তি­পা­লন হয়। আবার শত্রু­­ক্ষ অতি নি­কট। তা­হা­রাই বা কি কা­ণ্ড করিয়া বসে, তা­হা­রই বা বি­চি­ত্র কি? প্র­কা­শ্য স্থা­নে শূলে চড়াইয়া প্রা­­বধ করি­তে হই­বে, কথাও তা­হা­রা শু­নিয়াছে। শূলদ­ণ্ড যে দণ্ডায়মান হইয়াছে, তা­হাও স্প­ষ্ট­ভা­বেই দে­খি­তে­ছে। ইহা­তে যে তা­হা­রা একে­বা­রে নি­শ্চি­ন্ত থা­কি­বে, নি­র্বা­কে দণ্ডায়মান হইয়া ওমর আলীর বধ­ক্রিয়া স্ব­­ক্ষে দে­খি­বে, কখ­নোই বি­শ্বাস হয় না। হয় তো কোন নূতন কা­ণ্ড করিয়া তু­লি­বে।'
মারওয়ান বি­শেষ চি­ন্তা করিয়া আদেশ করিল, "বধ্যভূমি পর্য­ন্ত যা­­বার সু­প্র­­স্ত পথ মধ্যে রা­খিয়া উভয়পা­র্শ্বে সৈন্য­শ্রে­ণী দণ্ডায়মান করা হই­বে। প্র­­রী এবং প্র­ধান প্র­ধান সৈন্যা­ধ্য­ক্ষ ব্য­তীত সা­মা­ন্য সৈন্য কি কোন প্রা­ণী আমার বি­না­নু­­তি­তে পথে বধ্যভূমি­তে যা­­তে পা­রি­বে না।"
আদেশ মা­ত্র নি­ষ্কো­ষিত অসি হস্তে সৈন্য­গণ গায় গায় মি­শিয়া বধ্যভূমি পর্য­ন্ত গম­নো­­যো­গী প্র­­স্ত স্থান রা­খিয়া দুই শ্রে­ণী­তে পর­স্পর সম্মু­খে দণ্ডায়মান হইল। তখন শি­বির-দ্বার হই­তে শূলদ­ণ্ডের অগ্র­ভাগ স্প­ষ্ট­ভা­বে দে­খা যা­­তে লা­গিল। মারওয়ান পু­­রায় আজ্ঞা করিল, "শূলদ­ণ্ডের চতু­ষ্পা­র্শ্বে চক্রা­কার কতক স্থান রা­খিয়া শূলদ­ণ্ড­সহ চক্রা­কার স্থান সজ্জিত সৈন্য দ্বা­রা পরি­বে­ষ্টিত হই­বে। এক­শ্রে­ণী­তে চক্রা­কা­রে স্থান বে­ষ্টন করি­লে শঙ্কা দূর হই­বে না। সপ্ত­­ক্র সৈন্য দ্বা­রা স্থান বে­ষ্টন করি­তে হই­বে। চতু­র্দি­কে প্র­­রী নি­যু­ক্ত থা­কি­বে! বি­­ক্ষ­দল হই­তে সা­মা­ন্য এক­টি প্রা­ণীও আমা­দের নি­র্দি­ষ্ট সী­মা অতি­ক্রম করিয়া না আসি­তে পা­রে-সে বিষয়ে বি­শেষ লক্ষ্য রা­খি­তে হই­বে। আবার এদি­কেও শি­বি­­দ্বার চতু­ষ্টয়ে এবং সী­মা­ন্ত স্থা­নে রক্ষী­দি­গের উপ­রেও সজ্জিত সৈন্য দ্বা­রা বি­শেষ সত­র্কে শি­বির রক্ষা করি­তে হই­বে।"
মারওয়ান সৈন্যা­ধ্য­ক্ষ­­­কে আহ্বান করিয়া আরো আজ্ঞা করিল "যে সকল সৈন্য বি­শেষ শি­ক্ষিত পু­রা­তন, তা­হা­দের দ্বা­রা শি­বির এবং শি­বি­­দ্বার চতু­ষ্টয় রক্ষা করি­তে হই­বে। উত্তর, পূর্ব দক্ষিণ সী­মার প্র­ত্যেক সী­মায় সহ­স্র সহ­স্র সৈন্য তীর, বর্শা তর­বা­রি­­স্তে রক্ষীরূপে দণ্ডায়মান থা­কি­বে। শি­বি­রের মধ্যে যে­খা­নে যে­খা­নে প্র­­রী নি­যু­ক্ত আছে, সেই সেই স্থা­নে দ্বি­গু­ণিত প্র­­রী সম্ভব মত সৈন্য নিয়োজিত করিয়া শি­বির রক্ষা করি­তে হই­বে। সৈন্যা­ধ্য­ক্ষ­গণ আপন আপন সৈন্য­­লের প্র­তি বি­শেষ সত­র্কি­­ভা­বে দৃ­ষ্টি রা­খি­বেন।"
"ওমর আলীর বধ­সা­ধন হই­তে কল্য প্র­ভাত পর্য­ন্ত সা­ধ্যা­তীত সত­র্ক­তার সহিত থা­কি­তে হই­বে।সৈন্যা­ধ্য­ক্ষ­গণ অশ্বা­রো­হী হইয়া মুহূর্তে মুহূর্তে শি­বি­রের চতু­ষ্পা­র্শ পরি­বে­ষ্টন করি­বেন। ওমর আলীর বধ­সা­­নে হর্ষ, বি­পদ, বি­ষাদ সক­লই রহিয়াছে, সকল দি­কেই দৃ­ষ্টি রা­খি­তে হই­বে। সা­­ধান, আমার এই আজ্ঞার অণু­মা­ত্রও যেন অন্য­থা না হয়। যে সকল সৈন্য নূতন গ্র­হণ করা হইয়াছে, তা­হা­দি­­কে কখ­নোই শি­বির রক্ষার কা­র্যে, কি সী­মা রক্ষার কা­র্য, কি প্র­­রীর কা­র্যে, কো­নরূপ কা­র্যে নি­যু­ক্ত করা হই­বে না। এমন কি আমার দ্বি­তীয় আদেশ পর্য­ন্ত তা­হা­রা শি­বির মধ্যে প্র­বেশ করি­তে পা­রি­বে না। প্র­কা­শ্য­ভা­বে তা­হা­দি­­কে সকল কথা না বলিয়া বা­হি­রের অন্য কোন কা­র্যে, কি শূলদ­ণ্ড যে প্র­ণা­লী­তে রক্ষা করার আদেশ হইয়াছে, তা­হা­তেই নি­যু­ক্ত করি­তে হই­বে। কি­ন্তু সে সপ্ত­­ক্রের সী­মা­­ক্রে, কি ষষ্ঠ বা পঞ্চম চক্রে তা­হা­দি­­কে নি­যু­ক্ত করা হই­বে না। প্র­থম, দ্বি­তীয় তৃ­তীয় চক্রেই তা­হা­দের স্থান,-শূলদ­ণ্ডের নি­কট হই­তে উপ­রো­ক্ত চক্র­ত্রয় ভি­ন্ন অন্য কোন চক্রে তা­হা­রা না যা­­তে পা­রে-সে বিষয়ে বি­শেষ সা­­ধান হই­তে হই­বে।"
মারওয়ান এই সকল আদেশ করিয়া, বন্দি­সহ বধ্যভূমি­তে যা­­তে উদ্যত হইল। বন্দি ওমর আলী চতু­র্দি­কে চা­হিয়া বধ্যভূমি­তে যা­­তে অস­ম্মত হই­লেন
মারওয়ান বলিল, "ওমর আলী! তু­মি জা­নিয়া শু­নিয়া কেন বি­হ্বল হই­তেছ? বন্দি­ভা­বে রাজ আজ্ঞা অব­হে­লা! তু­মি স্বে­চ্ছাপূর্বক বধ্যভূমি­তে না গে­লে আমি কি তো­মা­কে শূলে চড়াইয়া মা­রি­তে পা­রিব না?তু­মি এখনও যদি মহা­রাজ এজি­দের বশ্য­তা স্বী­কার কর, প্র­ভু বলিয়া মা­ন্য কর, অপ­রাধ মা­র্জ­না­হে­তু যোড়করে ক্ষ­মা প্রা­র্থ­না কর, তবে এখনও তো­মার প্রাণ রক্ষা হই­তে পা­রে। আমি মহা­রা­জের রো­ষা­গ্মি করি­তে করি­তে চে­ষ্টা করিব। বধ্যভূমি­তে যা­ইব না,- কি কথা? সা­ধ্য কি যে তু­মি না যাইয়া পার? তো­মা­কে নি­শ্চয়ই শূলদ­ণ্ডের নি­কট যা­­তে হই­বে,-নি­শ্চয়ই শূলে আরো­হণ করি­তে হই­বে,-বি­দ্ধ হই­তে হই­বে,-মরি­তে হই­বে।মহা­রাজ এজি­দের আজ্ঞা অল­ঙ্ঘ­নীয়।"
ওমর আলী বলি­লেন, "তু­মি যদি আমা­কে লইয়া যা­­তে পার, লইয়া যাও-শূলে দাও। কি­ন্তু আমি ইচ্ছাপূর্বক শূলদ­ণ্ডের নি­কট যা­ইব না,-শূলে আরো­হণ করা তো শে­ষের কথা। আমার প্রা­­বধ করাই তো তো­মা­দের ইচ্ছা; তর­বা­রি আছে আঘাত কর,-তীর আছে, বক্ষ'পরি লক্ষ্য কর,-বর্শা আছে, বি­দ্ধ কর,-গদা আছে, মস্তক চূর্ণ কর,-ফাঁস আছে, গলায় দিয়া শ্বাস বন্ধ কর, যে প্র­কা­রে ইচ্ছা হয় প্রাণ বা­হির কর। আমি শূলে চড়িব না।"
"আমি তো­মা­কে শূলে চড়াইব। মহা­রাজ এজি­দের আজ্ঞা প্র­তি­পা­লন করিব। তু­মি তো­মার প্রাণ বা­হির করি­বার দশ­টি উপায় বা­হির করি­লেও তা­হা গ্রা­হ্য হই­বে না। এক­মা­ত্র শূলদ­ণ্ডেই তো­মার জী­বন শেষ-কেন আমা­কে বি­­ক্ত কর?"
"তো­মার ক্ষ­­তা থা­কে, আমা­কে লইয়া যাও।"
"কেন? শূলে চড়িয়া প্রাণ দি­তে কি লজ্জা বোধ হয়? হায় রে লজ্জা! এমন অমূল্য জী­­নই যদি গেল তবে সে লজ্জায় ফল কি?"
"আমি তো­মার কথা শু­নি­তে ইচ্ছা করি না। তো­মার কা­র্য তু­মি কর, আমি আর এক পদও অগ্র­সর হইব না।"
"মুহূর্ত পরে যা­হার জী­­­কা­ণ্ড শেষ অভিনয় হইয়া, জী­­নের মত যব­নি­কা পত্তন হই­বে, তা­হার আবার আস্প­র্ধা?"
"দে­খ্ মারওয়ান! সা­­ধান হইয়া কথা বলি­স্! আমার হস্ত কঠিন বন্ধ­নে বাঁধা আছে, নতু­বা তোর মু­খের শা­স্তি করি­তে ওমর আলী­কে বে­শি দূর যা­­তে হইত না!"
মারওয়ান মহা­ক্রো­ধে ওমর আলী­কে পশ্চা­দ্দিক হই­তে সজো­রে ধা­ক্কা দিয়া বলিল, "চল, তো­কে পায় হাঁটাইয়া লইয়া শূলে চড়াইব।"
ওমর আলী নী­রব। মারওয়ান অনেক চে­ষ্টা করিল, তিল-পরি­মাণ স্থানও ওমর আলী­কে সরা­­তে পা­রিল না। লজ্জিত হইয়া বলিল, "সক­লে এক­ত্রে এক­যো­গে ধরিয়া তো­কে শূন্যে শূন্যে লইয়া যা­ইব।"
ওমর আলী হা­স্য করিয়া বলিল, "মারওয়ান তু­মি তো পা­রি­লে না। সক­লে এক­ত্র হইয়া আমা­কে শূলদ­ণ্ডের নি­কট লইয়া যা­­বে, ইহা­তে তো­মার গৌ­রব কি? তু­মি সু­খী হও কো­ন্ মু­খে?"
"আমি সু­খী হই বা না হই, তো­কে শূলে চড়াই?"
"এখান হই­তে লইয়া যা­­তে পা­রি­লে তো শূল?"
মারওয়ান প্র­­রি­­­কে বলিল, "তো­­রা অস্ত্র­­স্ত্র রা­খিয়া সক­লে ইহা­কে ধর, শূন্যে শূন্যে লইয়া আমার সঙ্গে আইস।"
প্র­­রি­গণ প্র­ভু-আজ্ঞা পা­লন করিল বটে, কি­ন্তু ওমর আলী সেই পা­ষাণ, সেই পা­ষা­ণময়-অচল। তি­নি যে পদ যে­খা­নে রা­খিয়াছি­লেন, সে পদ সেই খা­নেই রহিয়া গেল। প্র­­রি­গণ লজ্জিত-মারওয়ান রো­ষে অধীর
মারওয়ান পু­­রায় বলি­তে লা­গিল, "মহা বি­পদ! এখান হই­তে বধ্যভূমি পর্য­ন্ত লই­তেই এত কষ্ট, শূলের উপর চড়ান তো সহজ কথা নহে।"
ওমর আলী বলি­লেন, "মারওয়ান! চি­ন্তা কি? তু­মি যদি আমা­কে বধ্যভূমি পর্য­ন্ত লইয়া যা­­তে পার, তা­হা হই­লে আমি ইচ্ছা করিয়া শূলে চড়িব। তু­মি চি­ন্তা করিও না। যত­ক্ষণ থা­কি, জগ­তে হা­সি তা­মা­সা করিয়া চলিয়া যাই। মরণ কা­হার না আছে? আজ আমার এই প্র­কার মরণ হই­তে­ছে; কাল না হউক, কা­লে তো­মা­কেও অন্য প্র­কা­রে মরি­তে হই­বে।"
মারওয়ান মনে মনে বলি­তে লা­গিল, "এখান হই­তে ধরা­­রি করিয়া লইয়া গে­লেও তো শূলে চড়ান মহা­বি­পদ দে­খি­তে­ছি। আব­দু­ল্লা­হ্ জেয়াদ­কে ডা­কি।" এই স্থির করিয়া প্র­কা­শ্য­ভা­বে বলিল, "আব­দু­ল্লা­হ্ জেয়াদ­কে ডা­কিয়া আন, আর তা­হার অধী­নে কয়েক­জন বল­বা­ন্ সৈন্য গত­­ল্য সৈন্য­­লে নাম লি­খাইয়াছে, তা­হা­দি­­কেও এখা­নে আসি­তে বল।"
ওমর আলী বলি­লেন, "ওহে মন্ত্রী! কো­ন্ আব­দু­ল্লা­হ্ জেয়াদ? কু­ফা­­­রের জেয়াদ?-সেই নি­­­হা­রাম জেয়াদ? বি­শ্বা­­ঘা­তক জেয়াদ? না অন্য কেহ?"
"তা­হা­তে তো­মার প্রয়োজন কি?"
"প্রয়োজন কি­ছুই নাই-তবে পা­পা­ত্মার মু­­খা­না চক্ষে দে­খি­বার ইচ্ছা অনেক দিন হই­তে আছে।শী­ঘ্র আসি­তে বল, মর­­কা­লে দে­খিয়া যাই।"
"তো­মার অন্তি­­কাল উপ­স্থিত- সময়েও তো­মার হা­সি তা­মা­সা- সময়েও আমা­দি­­কে ঘৃ­ণা!"
"আমি তো আর তো­মার মত মূর্খ নহি যে, কা­রণ, কা­র্য যু­ক্তি অব­হে­লা করিয়া কে­বল ঈশ্ব­রের প্র­তি চা­হিয়া থা­কিব? তু­মি মনে করিয়াছ যে আম­রা তো­মার প্রা­­বধ করি­তে পা­রিব না,-আমা­দের হস্তে মরি­বে না। ওমর! অঙ্গারও যদি হরি­দ্রার কা­ন্তি পায়, মশকও যদি সমু­দ্র শু­ষিয়া ফে­লে, অচল যদি সচ­­ভাব ধা­রণ করে, সূর্য­দেবও যদি পশ্চি­মে উদিত হয়, তথাচ তো­মার জী­বন কখ­নোই রক্ষা হই­তে পা­রে না।মারওয়ানের হস্ত হই­তে বাঁচিয়া প্রাণ বাঁচা­­তে পা­রি­বে না। মুহূর্ত পরেই তো­মার চক্ষের পা­তা ইহ­কা­লের জন্য বন্ধ হই­বে। শূলদ­ণ্ড তো­মার মস্তক ভেদ করিয়া বহি­র্গত হই­বে। এখনও বাঁচি­বার আশা-জেয়াদ­কে দে­খি­বার আশা?"
"অত বক্তৃ­তা করিও না, অত অদৃ­ষ্ট দিয়াও আমা­কে বু­ঝাইও না। ঈশ্ব­রের মহি­মার পার নাই।তি­নি হজ­রত ইব্রা­হি­­কে অগ্নি হই­তে, ইউ­সু­­কে কূপ হই­তে, নু­হ্কে তু­ফান হই­তে রক্ষা করিয়াছি­লেন! কত জন­কে কত বি­পদ, কত কষ্ট, কত দু­ঃখ হই­তে উদ্ধার করিয়াছেন, করি­তে­ছেন এবং করি­বেন। আর আমা­কে এই সা­মা­ন্য বন্ধন হই­তে এজি­দের আদেশ হই­তে, আর নি­তা­ন্ত আহ­ম্মক! মন্ত্রী মারওয়ানের হস্ত হই­তে উদ্ধার করা তাঁহার কত­ক্ষ­ণের কা­র্য!"
"তো­মার ঈশ্বর, যু­ক্তি কা­­ণের নি­কট পরা­স্ত। আমি যদি তো­মার বন্ধন না খু­লিয়া দেই, তো­মার ঈশ্বর অদৃ­শ্য­ভা­বে খু­লিয়া দি­ন্ দে­খি? কা­রণ ব্য­তীত কো­ন্ কা­লে কো­ন্ কা­র্য হইয়াছে? দৈব কথা দৈবশ­ক্তি ছাড়িয়া দাও,-না হয় তো­মার বস্ত্রা­ঞ্চ­লে বাঁধিয়া রাখ, কথায় মারওয়ানের মন টলি­বে না।"
"মন টলি­বে না বটে, টলি­তে পা­রে।"
"পূর্বেই বলিয়াছি-মারওয়ান তো­মার মত পা­গল নহে।"
এদি­কে বী­­বর আব­দু­ল্লা­হ্ জেয়াদ কয়েক­জন সজ্জিত সৈন্য­সহ মারওয়ানের নি­কট উপ­স্থিত হইয়া উপ­স্থিত ঘট­না দে­খিল-শু­নিয়া আরো চমৎকৃত হইল। ক্ষ­­কাল পরে জেয়াদ গম্ভীর স্ব­রে বলিল, "আমি ওমর আলী­কে বধ্যভূমি­তে লই­তে­ছি। কি আশ্চ­র্য, ওমর আলী­কে মৃ­ত্তি­কা হই­তে শূন্যে উত্তো­লন করা যায় না, কি কথা! অস্ত্রের সা­হা­য্যে সক­লেই সকল করি­তে পা­রে।"
জেয়াদ ওমর আলীর নি­কট যাইয়া তাঁহা­কে মৃ­ত্তি­কা হই­তে শূন্যে তু­লি­তে অনেক চে­ষ্টা করিল,-পা­রিল না। লজ্জা রা­খি­বার আর স্থান কো­থায়? বি­­ক্ত ভা­বে বলিল, "বা­­রাম! তু­মি তো আপন বা­হু­­লের ক্ষ­­তা অনেক দে­খাইয়াছ-উঠাও।"
মারওয়ান বলিল, "বা­­রা­মের বা­হু­বল দে­খিয়া আমি চমৎকৃত হইয়াছি। সত্য কথা বলি­তে কি গু­ণেই আমি বা­­রা­­কে সৈন্য­­লে আদ­রে গ্র­হণ করিয়াছে। এখন পদো­ন্ন­তি-পু­­স্কার সক­লই যদি ওমর আলী­কে-"
বা­­রাম মারওয়ান এবং জেয়াদ­কে অভি­বা­দন করিয়া বলিল, "গো­লাম এখ­নই হু­কুম তা­মিল করি­তে­ছে।"
ওমর আলী আড়নয়নে বা­­রা­­কে দে­খিয়া বলি­লেন, "জেয়াদ! কত জন­কে ঠকা­­তে চাও?স্ব­প্ন-বি­­­ণে প্র­ভু হো­সে­­কে ঠকাইয়াছ, মদি­নার বি­খ্যাত বীর মো­­লে­­কে ঠকাইয়াছ, আজ আবার কা­হা­কে ঠকা­­বে?"
জেয়াদ বলিল, "তো­মার অস্ত্রের ধার বদ্ধ হইয়াছে, কি­ন্তু কথার ধা­­টু­কু এখনও আছে। এখ­নই সে ধার বদ্ধ হই­বে! উপ­যু­ক্ত লোক আনিয়াছি।"
"উপ­যু­ক্ত লোক হই­লে অব­শ্যই পরা­ভব স্বী­কার করিব। সে যা­হা বলি­বে, বি­না বা­ক্য­ব্যয়ে শু­নিব। কি­ন্তু মরা বাঁচা ঈশ্ব­রের হাত।"
"আরে মূর্খ! এখনও মরা বাঁচা ঈশ্ব­রের হাত? তো­মার ঈশ্বর এখনও তো­মা­কে বাঁচা­­বেন,-ভর­সা আছে? ইচ্ছা করি­লে কে­বল মহা­রাজ এজি­দ্ বাঁচা­­লে বাঁচা­­তে পা­রেন।"
"রে বর্বর জেয়াদ! তুই ঈশ্ব­রের মহি­মা কি বু­ঝি­বি-পা­মর?"
"তো­মার হি­তো­­দেশ আর শু­নি­তে ইচ্ছা করি না। এখন গা­ত্রো­ত্থান করুন, যমদূত শিয়রে দণ্ডায়মান।"
ওমর আলী জেয়াদের কথায় কোন উত্তর করি­লেন না, সেই পূর্ববৎ দণ্ডায়মান, সেই অটল-অচল
জেয়াদ বা­­রা­­কে পু­­রায় বলিল, "আর দেখ কি? উহা­কে বধ্যভূমি­তে লইয়া চল।"
বা­­রাম সি­ংহ বি­ক্র­মে ওমর আলী­কে ধরিল এবং 'জয় মহা­রাজ এজি­দ্' শব্দ করিয়া একে­বা­রে শূন্যে উঠাইয়া বলিল, "হু­কুম হয়ত এই স্থা­নে ইহার বধ-ক্রিয়া সমা­ধা করিয়া দেই। এক আছাড়েই অস্থি চূর্ণ করিয়া মজ্জা বা­হির করি।"
বা­­রা­মের বা­হু­বল দে­খিয়া মারওয়ান জেয়াদ শত মু­খে প্র­শং­সা করি­তে লা­গিল। মারওয়ান উচ্চৈঃস্ব­রে বলি­তে লা­গিল, "বা­­রাম! ওমর আলী­কে মা­রিয়া ফে­লিও না। রা­জা­জ্ঞা তা­হা নহে। শূলে চড়াইয়া মা­রি­তে হই­বে। শি­বি­রের মধ্যে প্রাণ বধের ইচ্ছা থা­কি­লে অনেক উপায় ছিল। শূলদ­ণ্ড পর্য­ন্ত ইহা­কে শূন্য­ভা­বে লইয়া যা­­তে হই­বে।"
"যো হু­কুম" বলিয়া বা­­রাম এজি­দের জয় ঘো­­ণা করি­তে করি­তে ওমর আলী­কে তৃ­ণবৎ লইয়া চলিল। মারওয়ান জেয়াদ হা­সি­তে হা­সি­তে আর আর সঙ্গী­সহ চলিল। কি ভয়ানক! সক­লের চক্ষেই ভীম-দর্শন। শূলদ­ণ্ডের চতু­ষ্পা­র্শ্বে চক্রা­কা­রে সৈন্য­শ্রে­ণী দণ্ডায়মান। দর্শ­­­ণের চক্ষু,-শূলের অগ্র­ভা­গে। কা­হা­রো মু­খে কথা নাই। সক­লেই নী­রব। প্রা­ন্তর নী­রব
বা­­রাম ওমর আলী­কে শূলদ­ণ্ডের নি­কট লইয়া ছাড়িয়া দি­লেন, জেয়াদ মারওয়ান পু­নঃ পু­নঃ বা­­রা­মের প্র­শং­সা­বাদ করি­তে লা­গিল, অব­শে­ষে বলিল, "বী­­বর বা­­রাম! তু­মি ওমর আলী­কে শূলদ­ণ্ডে চড়াইয়া রা­জা­জ্ঞা প্র­তি­পা­লন কর।"
জেয়াদ মারওয়ান­কে বলিল, "আমার ইচ্ছা, যে পর্য­ন্ত যু­দ্ধ শেষ না হয়, সে পর্য­ন্ত ওমর আলী শূলদ­ণ্ডেই বি­দ্ধ থা­ক্!"
মারওয়ান বলিল, "কথা­টা বড় গু­রু­তর! মহা­রা­জের অভি­প্রায় জা­না আব­শ্যক। শত্রুর মনে কষ্ট দি­তে, তো­মার যু­ক্তি সর্ব­প্র­ধান বটে-কি­ন্তু রা­জা­জ্ঞা তা­হা নহে। আমার মতে মৃত দে­হে শত্রু­তা নাই, কি­ন্তু হা­নি­ফার বি­শেষ মনো­­ষ্টের কা­রণ হই­বে তা­হা­তেও সন্দেহ নাই। শত্রু­কে জব্দ করাই তো কথা তো­মার মত প্র­কাশ করিয়া মহা­রা­জের নি­কট হই­তে ইহার মী­মা­­সা করিয়া আসি­তে­ছি। তু­মি এদি­কের কা­র্য শেষ কর।আমার প্র­তি যে ভার অর্পিত হইয়াছিল, আমি সে ভার তো­মা­কে অর্পণ করি­লাম। তু­মি ওমর আলী­কে মহা­রা­জের আজ্ঞা­মত বধ কর। আমি মহা­রা­জের নি­কট হই­তে কথার মী­মা­­সা করিয়া এখ­নি আসি­তে­ছি।"
জেয়াদ বা­­রা­­কে বলিল, "বা­­রাম! বন্দি­কে জি­জ্ঞা­সা কর, এখন তার আর কথা কি?এখনও মহা­রাজ এজি­দ্ দয়া করি­লে করি­তে পা­রেন।"
বা­­রাম জি­জ্ঞা­সা করিল, "ওমর আলী! তো­মার অন্তি­­কাল উপ­স্থিত! কোন কথা বলি­বার থা­কে বল,-আর বি­­ম্ব নাই।"
ওমর আলী বলি­লেন, "এত­ক্ষণ অনে­­বার বলিয়াছি, আর কোন কথা নাই। তবে ইচ্ছা যে, যা­­বার সময় এক­বার ঈশ্ব­রের উপা­­না করিয়া যাই। কি­ন্তু আমার হস্ত পদ যে কঠিন বন্ধ­নে বাঁধা আছে, ইহা­তে সম্পূর্ণরূপে উপা­­নার ব্যা­ঘাত হই­তে­ছে। যদি তো­মা­দের সা­হস হয়, তবে আমার হস্তের বন্ধন খু­লিয়া দাও।আমি অন্তিম সময়ে এক­বার পরম কা­রু­ণিক পর­মে­শ্ব­রের যথা­র্থ নাম উচ্চা­রণ করিয়া আমার জা­তীয় উপা­­নায় অন্ত­­কে পরি­তৃ­প্ত করি"
জেয়াদ বলিল, "ওমর! আমি তো­মার হস্তের বন্ধন খু­লিয়া দি­তে­ছি। তু­মি স্ব­চ্ছ­ন্দে তো­মার ইষ্ট-দে­­তার নাম কর, তো­মার ঈশ্ব­­কে যথা­বি­ধি পূজা কর, মৃ­ত্যু­কা­লে ঈশ্ব­রের নাম করি­তে আমি কখ­নোই বা­ধা দিব না। ঈশ্বর তো­মা­কে যে এখনও রক্ষা করি­তে পা­রেন ভ্রমও পরী­ক্ষা কর। আমি তো­মা­কে তো­মার ইষ্ট-দে­­তার শপথ দিয়া বলি­তে­ছি তো­মার উদ্ধা­রের জন্য কায়মনে তো­মার নি­রা­কার নি­র্বি­কার দয়াল প্র­ভুর নি­কট আরা­­না কর।" এই বলিয়া জেয়াদ স্ব­­স্তে ওমর আলীর বন্ধন মো­চন করিয়া দিল!
ওমর আলী, মৃ­ত্তি­কা দ্বা­রা (জলা­ভা­বে মৃ­ত্তি­কা­দ্বা­রাও শরীর পবি­ত্র করি­বার বি­ধি আছে, তা­হার নাম "তয়ন্মুখ।") "আজু" ক্রিয়া সমা­পন করিয়া যথা­রী­তি ঈশ্ব­রের উপা­­না করি­লেন। উপা­­নার পর দুই হস্ত তু­লিয়া মহা­প্র­ভুর গু­ণা­নু­বাদ করি­তে করি­তে শূলদ­ণ্ডের চতু­র্দি­কে চা­হিয়া দে­খি­লেন এবং বী­­ত্বের সহিত ঈশ্ব­রের নাম উচ্চা­রণ করিয়া দণ্ডায়মান হই­লেন। ওমর আলীর সঙ্গে সঙ্গে বা­­রাম বলিয়া উঠি­লেন, "জেয়াদ! বি­শ্বা­­ঘা­­­তার ফল গ্র­হণ কর। মো­­লে­মের প্র­তি­শোধ গ্র­হণ কর! ওমর আলী­কে উদ্ধার করি­তে আসিয়া তো­মা­কে সু­যো­­­তে পাইয়াছি-ছাড়িব না।" এই বলিয়া সজোর আঘা­তে জেয়াদ-শির দে­­বি­চ্ছি­ন্ন হই­লে, শি­­সং­যু­ক্ত কে­­গু­চ্ছ ধরিয়া, শি­­­স্তে বা­­রাম বলি­তে লা­গি­লেন, "রে বি­­র্মী এজি­দ্! দেখ, কি কৌ­­লে বা­­রাম ওমর আলী­কে লইয়া চলিল। কে­বল ওমর আলী­কে উদ্ধার করি­বার জন্যই বা­­রাম ছদ্ম­বে­শে তো­মার প্রিয় সে­না­­তি জেয়াদের আশ্রয় গ্র­হণ করিয়াছিল। আমি মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফার দাস। যু­দ্ধ সময়ে আগ­ন্তুক সৈন্য গ্র­হণ করার এই প্র­তি­ফল! সৈন্য বৃ­দ্ধি লা­­সায় ভবি­ষ্যৎ চি­ন্তা ভু­লিয়া যাওয়ার এই ফল। দে­খ্-এই দে­খ্ আজ কি ঘটিল। আগ­ন্তুক সে­নায় বি­শ্বাস নাই বলিয়া তো­মার মন্ত্রী­প্র­বর শূলদ­ণ্ডের প্র­থম, দ্বি­তীয় তৃ­তীয় চক্রে নূতন সে­না সন্নি­বে­শিত করিয়াছেন। ইহা­রা বা­হির চক্রে থা­কি­লে কি জা­নি কি বি­পদ ঘটায় তাঁহার এই দু­শ্চি­ন্তায় ঈশ্বর আমা­দে­রই মঙ্গল করিয়াছেন। এখন দে­খ্! বা­­রাম জেয়াদের শির লইয়া বী­­ত্ব প্র­কা­শে ওমর আলী­কে সঙ্গে লইয়া চলিল।"
ওমর আলী জেয়াদের কটি­­ন্ধ হই­তে তর­বা­রি সজো­রে টা­নিয়া লইয়া বলি­তে লা­গি­লেন, "মো­হা­ম্ম­দীয় ভ্রা­তা­গণ! আর কেন? প্র­ভুর নাম ঘো­­ণা করিয়া ঈশ্ব­রের গু­­গান করি­তে করি­তে শি­বি­রে চল। ওমর আলী সহ­জেই উদ্ধার হই­লেন। আর আত্ম­গো­­নে প্রয়োজন কি?" প্র­থম, দ্বি­তীয়, তৃ­তীয় চক্রের সে­না­গণ সম­স্ব­রে, "আল্লাহ আক­বর, জয় মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফা! জয় মো­হা­ম্মদ হা­নি­ফা!" বলিয়া ফি­রিয়া দাঁড়াইল। দে­খি­তে দে­খি­তে চতু­র্থ এবং পঞ্চম চক্র ভেদ করিয়া ষষ্ঠ চক্রে গিয়া পড়িল। ঘোর সং­গ্রাম-অবি­শ্রা­ন্ত অসি চলি­তে লা­গিল। এজি­দের বি­শ্বা­সী সৈন্য­গণ, যা­হা­রা ষষ্ঠ এবং সপ্তম চক্রে ছিল, হঠাৎ স্ব­­ক্ষীয় সৈন্য­দি­গের বি­দ্রো­হি­তা দে­খিয়া মহা ভীত হইল! বা­হি­রের শত্রু ওমর আলী­কে না লই­তে পা­রে, ইহাই তা­হা­দের মনের ধা­­ণা, তা­হা­তেই মনঃ­সং­যোগ সত­র্ক­তা। হঠাৎ বি­­রীত ভাব দে­খিয়া কি­ছুই স্থির করি­তে পা­রিল না। কো­থা হই­তে কি ঘটিল, কি কা­­ণে সৈন্য­গণ বি­দ্রো­হী হইল, কি­ছুই সন্ধান করি­তে পা­রিল না। জেয়াদের খণ্ডিত শির অপ­রি­চিত সৈন্য­­স্তে দে­খিয়া মহা­রাজ এজি­দ্ বাঁচিয়া আছেন কি না, ইহাই সম­ধিক শঙ্কার কা­রণ হইল। চক্র টি­কিল না, মুহূর্ত­­ধ্যে চক্র ভগ্ন করিয়া ওমর আলী এবং বা­­রাম সঙ্গি­­­সহ বা­হি­রে আসি­লেন। যা­হা­রা সম্মু­খে পড়িল তা­হা­রাই রক্ত­মা­খা হইয়া মৃ­ত্তি­কা­শায়ী হইল
আশা ছিল কি?-ঘটিল কি? কো­থায় ওমর আলীর শূলবি­দ্ধ শরীর সক­লের চক্ষে পড়িবে,-না জেয়াদের খণ্ডিত দেহ দে­খি­তে হইল। মারওয়ানের দু­­খের সী­মা নাই। ওদি­কে হা­নি­ফা শি­বি­রে শত সহ­স্র বিজয় নি­শান উড়িতে­ছে, সন্তো­ষসূচক বা­­নায় দা­মে­স্ক প্রা­ন্তর কাঁপাইয়া তু­লি­তে­ছে। এজি­দ্ সং­বা­দে ক্ষি­প্ত প্রায় হইয়া বধ্যভূমি­তে আগ­মন করিল এবং বলি­তে লা­গিল "হায় হায়! কার বধ কে করিল? যা­হা হউক হা­নি­ফার উচ্চ চি­ন্তার বলে ওমর আলী কৌ­শল করিয়া প্রাণ বাঁচা­ইল। আমা­দেরও শি­ক্ষা হইল। সম­­ক্ষে­ত্রে আগ­ন্তুক সৈন্য­কে বি­শ্বাস করিয়া সৈন্য­শ্রে­ণী­তে গ্র­হণ করার ফল, প্র­ত্য­ক্ষ প্র­মা­­সহ স্প­ষ্ট­ভা­বে দে­খাইয়া দিলআমা­দের অজ্ঞ­তা, অদূর শি­ক্ষার কা­র্য­ফল, হা­তে হা­তে প্রা­প্ত হই­তে লা­গিল। আমার ইহা­তে দু­ঃখ নাই। কি­ন্তু জেয়াদের শি­রশূন্য দেহ দে­খিয়া কি­ছু­তেই স্থির থা­কি­তে পা­রি­তে­ছি না। জেয়াদের শির আজ হা­নি­ফার শি­বি­রে যা­­বে, এক­থা কা­হার মনে ছিল?-কে ভা­বিয়াছিল?-কি­ন্তু চি­ন্তা কি? এখ­নই প্র­তি­শোধ, এখ­নই ইহার প্র­তি­শোধ লইব। শূলদ­ণ্ড যে ভা­বে আছে, সেই ভা­বেই রা­খিব। ভবি­ষ্যৎ বি­পদ গণ­না করিয়া আর বি­রত হইব না। আর কা­হা­রো কথা শু­নিব না। যাও-এখ­নই দা­মে­স্কে যাও। জয়নাল আবে­দী­­কে বাঁধিয়া আন। শূলদ­ণ্ডে তা­হা­কে চড়াইয়া প্রিয় বন্ধু জেয়াদের শোক নি­বা­রণ করিব,-মনের দু­ঃখ নি­বা­রণ করিব। জয়নাল বধে শত শত বা­ধা দি­লেও এজি­দ্ আজ ক্ষা­ন্ত হই­বে না। শূলে চড়াইয়া শত্রু­বধ করি­তে পা­রি কি না হা­নি­ফা­কে দে­খা­­তে এজি­দ্ কখ­নোই ভু­লি­বে না! বন্দি­কে ধরিয়া আনিয়া শূলে চড়াইব, ইহা­তে আর আশ­ঙ্কা কি? শঙ্কা থা­কি­লেও আজ এজি­দ্ কি­ছু­তেই সঙ্কু­চিত হই­বে না। এখ­নই যাও। মারওয়ান এখ­নই যাও, জয়না­­কে করিয়া আন-এজি­দ্ এই বধ্যভূমি­তেই রহিল। ভে­রীর বা­­নার সহিত, ডঙ্কার ধ্ব­নির সহিত, নগ­রে, প্রা­ন্ত­রে, সম­­ক্ষে­ত্রে, হা­নি­ফার শি­বি­রের নি­­টে ঘো­­ণা করিয়া দাও যে, ওমর আলীর জন্য যে শূলদ­ণ্ড স্থা­পন করা হইয়াছিল, সেই শূলদ­ণ্ডে জয়না­­কে চড়াইয়া জেয়াদের প্র­তি­শোধ লওয়া যা­­বে।"
মারওয়ান আর দ্বি­রু­ক্তি করিল না। রা­জা­দেশ মত ঘো­­ণা প্র­চা­রের আজ্ঞা করিয়া সপ্ত­বি­­­তি অশ্বা­রো­হী সৈন্য­সহ অশ্ব­রো­­ণে তখ­নই নগ­রা­ভি­মু­খে ছু­টিল

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#উপন্যাস
#অনুবাদ
#মোলাকাত
#Molakat
#Novel
#Translation
#BanglaLiterature
#Literature
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#বাংলাসাহিত্য
#সাহিত্য
#বিষাধসিন্ধু
#মীর_মশাররফ_হোসেন

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.