সংস্কৃতি ও দেশ-কাল ।। মাহবুবুল হক

 
সংস্কৃতি নিয়ে এখন নানা কথা হচ্ছে। এখানে যেসব ধর্ম আছে, সেসব ধর্মের প্রভাবে যে জীবনাচারণ, যেসব রসম-রেওয়াজ এবং যেসব সামাজিক রীতি-নীতি গড়ে ওঠেছে তাই আমাদের সংস্কৃতি। ব্যক্তির সংস্কৃতি হয় না, সংস্কৃতি সবসময় সমষ্টির। এখানকার সমষ্টি আবার নানাভাগে বিভক্ত। ধর্মই প্রধান উৎস। সমস্যা হয় তখন, যখন মাইনিরিটির সংস্কৃতি মেজরিটিরা গ্রহণ করার জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে।
ধর্ম সংস্কৃতি এক বিষয় নয়। একটি কোন ক্ষেত্রে স্থান-কাল পাত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, অপরটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। ধর্মের অবস্থানও এক নয়। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এর রূপ প্রকৃতি আলাদা। সনাতন ধর্মের কথাই ধরা যাক। বাংলাদেশে সনাতন ধমের রূপ প্রকৃতি যেমন, ভারতীয় পশ্চিমভঙ্গে ঠিক তা নয়। আবার পশ্চিমবঙ্গের আদলের সাথে দক্ষিণ ভারতীয় সনাতন ধর্মের মিল নেই। মিল নেই উত্তর ভারতের সাথেও। আমাদের দেশে প্রধান পূজা হলো দূর্গা পূজা। অথচ উত্তর বা দক্ষিণ ভারতে দূর্গাপূজার প্রাধান্য নেই। গনেশ পূজার প্রাধান্য বেশী। হিন্দু রাষ্ট্র নেপালের সনাতন ধর্মেও সাথে ভারতের অনেকাংশের সনাতন ধমের মিল নেই। সুতরাং ধর্মের একক কোন স্ট্রাকচার নেই। স্থান-কাল-পাত্রভেদে এর রূপ আলাদা- এর আদল আলাদা। কারণ, স্থানীয়তা, লোকাচার- মোটা দাগে সংস্কৃতি।
ধর্ম এককভাবে কোন জাতিসত্তা গড়ে তোলে না। তুললে নেপাল ভারত একই জাতিসত্তার বন্ধনে আবব্ধ হয়ে যেতো। একই ধর্মের অনুসারী দুটি দেশের জাতিসত্তা আলাদা। দুটি দেশের জাতিগত পরিচয় আলাদা। আত্মপরিচয়ের ভিত বা সোপান আলাদা। সে কারণে দুটি দেশের মানুষের স্বপ্ন বা ভিশন আলাদা। একজন নেপালী যে দৃষ্টিভঙ্গিতে যে স্বপ্ন দেখেন, একজন ভারতীয় সে দৃষ্টিতে সে স্বপ্ন দেখেন না। একই ধর্মেও অনুসারী হলেও অঞ্চল ভেদে মানুষের স্বপ্ন, ভিশন বা দৃষ্টিভঙ্গি এক হয় না। কারণ, ওই এক- সংস্কৃতি।
এইযে অঞ্চল ভেদ - এটাই স্থান-কাল-পাত্র এবংএরই সামগ্রিক রূপ হলো সংস্কৃতি। সংস্কৃতি একক কোন বিষয় নয়। বহু বিষয়ের আধার। অনেকটা সমুদ্রের মতো। বহু নদ-নদী সমুদ্রে এসে মিলেছে। নদ-নদীরাও আবার সমুদ্রে এসে মেশার আগে পাহাড়-পর্বত সমতট মাড়িয়ে এসেছে। নদী থেকে উপনদী শাখানদী বেরিয়ে এদিক সেদিক তোলপাড় করে আবার আপন ঘরানায় এসে ঠাঁই করে নিয়েছে। আবার সমুদ্র কি আলাদা প্রকান্ড কোনো ভিন্ন পাত্র? ডবচ্ছিন্ন কোনো জলাধার? একেবারেই একক কোন সত্তা? ইা, তাতো নয়। এভাবে সাত সমুদ্র হাতে ধরে পৃথিবীর মানুষকে প্রেমভরে আহবান জানাচ্ছে এই বলে যে, আস সবাই মিলে হাতে হাত ধরে দাড়াঁও, আপন পরিচয়ে উদ্বেলিত হয়ে বিশ্বজনীন বিভায় উদ্ভাসিত হও। এই যে আপন পরিচয়, এটাই সংস্কৃতির প্রধান পরিচয়। বিশ্বজনীন সংস্কৃতি বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।
সমুদ্রের মতো সংস্কৃতি বহুকিছু বা বহুবিষয় ধারণ করে। সমুদ্রের মধ্যে যেমন বহু নদ-নদী এসে বিলীন হয়, সংস্কৃতির মাঝে তেমনি বিলীন হয় একটি খন্ডের ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য. জীবনাচার, মূল্যবোধ, লোকাচার, আইন-কানুন, বিধি-ব্যবস্থা, প্রকৃতি, পরিবেশ, পারিপার্শিকতা এবং আরও অনেক কিছু।
সমুদ্র স্থবির কোন জলাধার নয়, সংস্কৃতিও স্ট্যাটিক কোন বিষয় নয়। সমুদ্র বহমান, সংস্কৃতিও বহমান। সমুদ্র শুধু ধারণ করে না বিতরণও করে। সংস্কৃতিও তাই। পঞ্চাশ বছর আগের বঙ্গোপসাগর আর এখানকার বঙ্গোপসাগরের রূপ প্রকৃতি এক নয়। সংস্কৃতির অবস্থাও তাই। সমুদ্র বদলায়, সংস্কৃতিও বদলায়। তবে আকাশ-বাতাস বদলায় না। এই বর্ণনাকে ধর্মের সাথে তুল্য মূল্য করা যায়।
ধর্ম সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে আবার সংস্কৃতিও ধর্মকে প্রভাবিত করে। দেশে যখন আদি সনাতন ধর্ম প্রতিষ্ঠিত ছিল, তখনকার সংস্কৃতির রূপ চিত্র ছিল মোটামুটিভাবে সর্বজনীন, সাবলীল এবং সাধারণ। বৌদ্ধরা এলো। বিনয় সমাসীন হলো দয়া, মায়া, মমতা, স্নেহ, প্রেম ওভালবাসা প্রতিষ্ঠিত হলো। পাল আমলে আমাদেও সংস্কৃতি প্রস্ফুটিত হয়েছিল।সকলের তওে সকলে আমরা’ - বিন্যাসিত হয়েছিল। মোটামুটিভাবে একটা পরিচ্ছন্ন উজ্জ¦লতায় আমরা পৌঁছেছিলাম। আঘাত হানলো দক্ষিণ ভারতের আর্যরা।
আর্যদের ব্রাক্ষণ্যবাদ এসে যখন চাপলো, তখন সংস্কৃতির আদি সার্বজনীন রূপ পাল্টে গেল। জাতিভেদ, ছোট-বড়, উঁচ- নীচ, বিভেদ, বিদ্বেষ, অচ্ছৎু- জনজীবনে প্রতিষ্ঠিত হলো। সংস্কৃতি বিভক্ত হলো। শাসক,উঁচু তলার মানুষ ব্রাক্ষণদের সংস্কৃতির প্রকৃতি ভোগসর্বস্ব রূপ ধারন করলো। প্রজাসাধারণ নিম্নবর্ণের মানুষের সংস্কৃতি ভিন্নরূপ ধারণ করলো। দুঃখ-বেদনা-যন্ত্রণা, হতাশা, নৈবদ্য, সমর্পন আত্মশ্লাঘা নানা ডাল-পালায় প্রসারিত হলো। মানুষের চিন্তা-চেতনা এবং বোধ বিশ্বোসে ফাটল ধরলো। হিংসা, বিদ্বেষ ঘৃণা জনমনে প্রবলভাবে সঞ্চারিত হলো। উঁচুতলা আর নীচু তলায় বিভাজিত হলো। একটা প্রবহমান শান্ত-সৈাম্য সহজ-সরল মানবিক সংস্কৃতি ভুলুন্ঠিত হলো। যে রাহুগ্রাস থেকে আমরা এখনও মুক্ত হতে পারছি না।
পালদের ওপর অন্যায়, অত্যাচার জুলুম চললো। সেনরা হিংসা, বিদ্বেষ জিঘাংসা ছড়িয়ে দিল। লক্ষ লক্ষ বৌদ্ধ হত্যা করলো। নিরীহ, শান্ত বিনয়ী বৌদ্ধরা হতাহত হলো। পালালো। যারা পালাতে পারলো না ধীরে ধীরে তারা ধর্মান্তরিত হলো। যারা ধর্মান্তরিত হলো না, তারা মাটিতে বুক ঠেকিয়ে বৌদ্ধ ধর্মেও শলতা জাগিয়ে রাখলো। এভাবে অঞ্চলের সংস্কৃতিও নানাভাবে আহত বিড়ম্বিত হতে থাকলো। সংস্কৃতির মূল সুরে অসুর এসে বাসা বাধঁলো। বেসুরো হয়ে উঠলো এখনকার পল্লবিত পাললিক সাংস্কৃতিক জীবন।
জাতিভেদ, বর্ণবাদ, রাজা-প্রজা, উচুঁ-নীচু, হিংসা-বিদ্বেষ তথা সামগ্রিকভাবে ভেদাভেদেও মনন তথা সংস্কৃতির কীটদংশ আবহে এখানকার জনজীবন যখন বিধ্বস্ত ইসলাম এলো তখন। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের-সৌন্দর্য যতটা না বিকশিত হলো, তারচেয়ে শতগুণে ইসলামের বিভা বিচ্ছুরিত হলো আরব, ইয়েমেন, ইরান তুরান থেকে আসা মুসলিম মনীষার দ্বারা।
ধর্মপ্রচার, ব্যবসা-বানিজ্য, পর্যটন, অভিবাসন- নানা কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মুসলিমরা এদেশে আসতে লাগলো।এখানকার ধর্মপরায়ণ সহজ-সরল মানুষকে তারা ভালবেষে ফেললো। শুধু মানুষ নয়, এখানকার আবহাওয়া, জলবায়ু প্রকৃতিকেও তারা আলিঙ্গন করলো। এমন নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া, নদ-নদী, সমুদ্র, দিগন্ত প্রসারিত বনভমি, পলিমাটি যুক্ত কৃষিভূমিসবাই উন্মাতাল কওে তুললো অভিবাসীদের। সুন্দও মানুষ সুষমাপূর্ণ প্রকৃতির এমন আকিঞ্চন তারা পৃথিবীর অন্য কোথাও প্রত্যক্ষ করেনি। কার্যব্যাপদেশে এসে আর য়েরা হয়নি নিজ নিজ দেশে। ভাষার প্রতিবন্ধকতা অভিবাসনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। অভিবাসী মুসলিমদেও চরিত্র, আচার, ব্যবহার, চাল-চলন, বিনয়, ভদ্রতা, নম্রতা, উদারতা, মহত্ত্ব, দান, পরোপকার, সেবা, আতিথিয়তা, সুবিচার, ত্যাগ-তিতিক্ষা তথা ভারসাম্যমূলক দরদী দৃষ্টিভঙ্গী বিপুলভাবে প্রলুদ্ধ করলো সাধারণ মানুষকে। সেনদের অত্যাচার, অবিচার নিষ্পেষণে জর্জরিত মানবগোষ্ঠী দলে-দলে ইসলাম গ্রহন করলো। ইসলামে তারা সাম্য, মৈত্রী ভ্রাতৃত্বেও আলোকজ্জ্বল রৌশনী অনুভব করতে পারলো। পালদের হারানো সুর বহূভঙ্গীমায় ঐশ্বর্য্যময় আবর্তে প্রত্যক্ষ করলো ইসলামে। ইসলামকে তারা  বৌদ্ধধর্মের উন্নত সংস্করণ বলেই শুধু মনে করলো না, মনে করলো শান্তি মুক্তির পাটাতন হিসেবে।
ইসলামের আলো অঞ্চলে বিচ্ছুরিত হয়েছে সপ্তম শতাব্দির গোড়া থেকে। দক্ষিণ এশিয়া দূর প্রাচ্যে যাওয়ার পথে সত্যেও পতাকাবাহী অগনিত মানুষ রসুল প্রেমিক এখানে এসে থমকে দাাঁড়িয়েছেন এবং স্থিত হয়েছেন, তার ইতিহাস সর্বজনবিদিত। ছয়শত বছরের আনাগোনা, মেলামেশা, লেন-দেন, ব্যবসা-বানিজ্য একটা সুস্থিও রাজ্য গঠনের মহান পরিবেশ তৈরী কওে দিয়েছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দিতে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী যখন রাজ্য জয় করলেন, তখন আর্য-ব্রাক্ষণ ছাড়া ধর্ম-বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে মুসলিমদের বিজয়কে সবাই স্বাগত জানালো। শুরু হলো এক সর্ব মানবিক সংস্কৃতির নবতর অভিযাত্রা। ইসলামী, আরবীয়, ইরানী এবং মধ্য এশীয় সংস্কৃতি স্থানীয় সয়স্কুতির সাথে প্রেমসূত্রে আবদ্ধ হলো। ভাললাগা এবং ভালবাসার উজ্জ্বল মেলবন্ধন তৈরি হলো। প্রেমপিয়াসীরা চোখে যেমন প্রেমাষ্পদের দোষ চোখে পড়ে না তেমনি সংস্কৃতির এই অবিরাম মিশ্রণে কোনো পক্ষই দোষ বিচারে লিপ্ত হয়না। এভাবেই প্রেম-ভালবাসার আবহে কেটেছে অনেকটা কাল।
মেনদেও পতন হলেও বৌদ্ধদেও মতো তারা নিশ্চিহ্ন হলো না। তারারুট-লেস হলো না। কারণ মুসলিম রাজন, শাসক, অধিপতিরা অত্যাচারী, অবিচারী বা জুলুমবাজ ছিলেন না। ছিলেন প্রেমময়, মানবতাবাদী এবং প্রজাহিতৈষী। তারা সব সময় আল্লাহর প্রিয় রসুলের বানীকে অনুসরণ করতেন।লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়া দিনে বাস্তব প্রেক্ষপটকে ভুলে যেতেন না। হিংসা, বিদ্বেষ, জিঘাংসা বা সামাপ্রদায়িকতাকে তারা প্রশ্রয দিতেন না। মানবিক কল্যাণভিত্তিক মুসলিম শাসন মেলবন্ধনের সংস্কৃতিকে বহমান করলেও সেনরা বিশিষ্টজনসহ একটি আলাদা গোষ্ঠী বা আলাদা সংস্কৃতিকে সজীব রাখতে সক্ষম হয়েছিল। জাতিভেদ বিচ্ছিন্নতা বা বিভাজন সত্ত্বেও সনাতন ধর্মের আশ্রয়ে বাঙ্গালীর আদি সংস্কৃতি বা শিকড় সংস্কৃতি নামে পৈারানিক সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলো। মুসলিম সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে লাগলো আল্লাহর একত্বে বিশ্ব জনীন মানবিক প্রনোদনায়, সাথে সাথে হিন্দু সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে লাগলো পৌত্তলিকতায়, বহুদেবত্বে এবং সংকীর্ণ ভোগ-লালসায়। একটি সংস্কৃতির পাটাতন তৈরী হলো স্বচ্ছতায়, পরিচ্ছন্নতায়, পবিত্রতায় এবং ইহকালীন পরকালীন সামগ্রিক স্বস্তি, শান্তি মুক্তির অন্বেষায়, পাশাপাশি মিকেন্দ্রিক লোকজ কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ মাৎসর্যে বিকশিত হতে লাগলো আরেক সংস্কৃতি - যাকে অঞ্চলের নিজস্ব সংস্কৃতি বলে প্রচার করা হলো - যা নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়েও আজও দেদিপ্যমান।
নিজস্ব বলতে ব্যক্তির যেমন কিছু থাকেনা, দেশ বা জাতিরও কিছু থাকেনা। গ্রেট ব্রিটেনের লোকেরা এককালে ছিল জেলে। সমুদ্রে মাছ ধরে তারা জীবন ধারণ করতো। রোমানরা বলেছে- রাস্তার বাম ধার ধরে চলতে হবে- বিষয়টি ব্রিটিশদের শেখাতে প্রায় একশ বছর লেগেছে। হাজার/বারশত বছর আগে কোন পর্যায়ে ছিল ব্রিটিশদের সভ্যতা এবং সংস্কৃতি, থেকে আঁচ করা যায় সেখানে সভ্যতা অতটা না থাকলেও সংস্কৃতি ছিল এবং সে সংস্কৃতি ছিল জেলে সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি। অনেকটা আমাদের দেশে বেদে-সংস্কৃতি। বেদেদের ধর্মীয় অনুশাসন যেমন কম, হাজার বারশত বছর আগে ব্রিটিশদের ধর্মীয় অনুশাসন ছিল তেমনই ঢিলে। কিন্তু ব্রিটিশরা কালে কালে বদলেছে। এককালে বেশীর ভাগ দুনিয়া শাসন করেছে। গড়ে তুলেছে নিজস্ব সভ্যতা এবং সংস্কৃতি।
সুতরাং পৃথিবীতে কোন কিছু স্থির নয়, বহমান। ধর্ম, সভ্যতা এবং সংস্কৃতি সবই বহমান। সবই পাল্টায়। সব কিছুরই রূপ রূপান্তর আছে। যেমন আছে ব্রক্তির শিশুকাল, কৈশোর কাল, যৈাবন কাল, প্রৌঢ় কাল এবং বার্ধক্যকাল।
আদর্শ বা মতবাদ যেমন মানুষের মতো কাল অতিক্রম করে সভ্যতা এবং সংস্কৃতিও কাল থেকে কালান্তর অতিক্রম করে। আমরা মহেনজোদারো সভ্যতা, রোম সভ্যতা, গ্রীক সভ্যতা, বেলিনীয়, মেসোপটিয়ান সভ্যতাসহ নানা সভ্যতার কথা জানি। এসব সভ্যতার উত্থান পতন হয়েছে যেমন, উত্থান ওপতন হয়েছে নানা ধর্ম, আদর্শ মতবাদের। মজার ব্যপার হলো সভ্যতা লয়প্রাপ্ত হলেও সংস্কৃতি লয়প্রাপ্ত হয়না। সংস্কৃতি মোটামুটিভাবে চিরঞ্জীব। সংস্কৃতির সলতে শিখা অনির্বানের মতো জ্বলতে থাকে। প্রমান, বিলীয়মান সভ্যতার অঞ্চলসমূহ। প্রাচীন সভ্যতা নাই কিন্তু সংস্কৃতির চিহ্ন আছে। আছে এর ক্ষীণতম অস্তিত্বত্ত।
অনেক দেশ ভেংগে যুগোস্লাভিয়া বানানো হলো। গড়ে উঠলো এক নতুন সভ্যতা আদর্শ। বার্ধক্যে পৌছে সে সভ্যতা খান খান হলো। সংস্কৃতির ভিত্তিতে পুনরায় রাষ্ট্রগুলি গজিয়ে উঠলো। দেখা গেল সভ্যতা মরেছে মতবাদ মরেছে, কিন্তু সংস্কৃতি মরেনি। একই কথা প্রযোজ্য সোভিয়েট ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও। রাষ্ট্রগুলি নিজস্ব সংস্কৃতির আবহে পুণরায় উজ্জীবিত হচ্ছে। সংস্কৃতি মওে না, এর রূপ রূপান্তর ঘটে। ব্রাক্ষন্য বা পৌত্তলিক সংস্কৃতি এবং আদি সনাতন সংস্কৃতি দেশে মরেনিএর নানা মাত্রিক রূপ-রূপান্তর ঘটেছে মাত্র। আর তা ছাড়া সংস্কৃতিকে মারার চেষ্টা করলেও তো তা মরেনা। আগেই বলেচি রূপান্তরসহ সংস্কৃতি চিরঞ্জীব।
আমাদেও দেশে আদিকালে এক ধরনের সংস্কৃতি ছিল। বৈৗদ্ধ, ব্রাক্ষন ইসলাম প্রবেশ করায় এখানে বহুমাত্রিক সংস্কৃতির অস্তিত্ব বিদ্যমান। এটা বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে স্বীকার কওে নিয়ে আমাদের জীবন জগৎ সাজাতে হবে।
ইসলাম পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র প্রবেশ করেছে। যেখানে গেছে সেখানকার মানবিক পরিচ্ছন্ন সংস্কৃতিকে ইসলাম ধারণ করেছে, আত্মস্ত করেছে। প্রয়োজনে রিমডেল প্রবেশ করেছে, রিকন্ডিশন করেছে। ছুড়েঁ ফেলে দেয়নি।
সংস্কৃতি আর ধর্ম এক বিষয় নয়। এক বিষয় হলে সকল মুসলিম রাষ্ট্রের সংস্কৃতি এক রকম হতো। আমরা সংস্কৃতির দিক থেকে পশ্চিমের মুসলিম রাষ্ট্রগুলি থেকে যেমন আলাদা, তেমনি আলাদা দূর প্রাচ্যেও মুসলিম রাষ্ট্রগুলি থেকে। এখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবনাচারণ যেমন আলাদা ঠিক তেমনি আরবের মুসলিম বা ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমদের প্রাত্যহিক জীবনচারণের সাথে আমাদের জীবনচারণের মিল নেই। তবে অমিল খোঁজা সংস্কৃতির কাজ নয়। মিল খোঁজা এবং একত্ব হওয়াই সংস্কৃতির কাজ। বর্জন করা ত্যাগ করা সংস্কৃতির কাজ নয়, সংস্কৃতির কাজ বরণ করা, গ্রহণ করা এবং উদাত্ত হওয়া।
মূলত: শিরক, পৌত্তলিকতা, ভোগসর্বস্বতা, অশ্লীলতা বাদ দিলে দুনিয়ার সকল সংস্কৃতিকে ইসলাম বাহু বন্ধনে আবধ্য করে সার্বজনীন বা বিশ্বজনীন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে।
সংস্কৃতির অপর নাম পরিচয়। ব্যক্তির পরিচয় নয় জাতির পরিচয়। জাতির আত্ম পরিচয়। ব্যক্তির পরিচয় যেমন পূর্বপুরুষকেন্দ্রিক, জাতিরও তাই। ব্যক্তির যেমন অতীত থাকে জাতিরও তাই। অতীত আমরা ডাস্টার দিয়ে মুছে ফেলতে পারি না। আমাদেও জীবনের সংগে বা জীবনাচারের সংগে তা লেপটে থাকে। এদেশে যারা ইরান, তুরান, ইয়েমেন বা আরব থেকে এসেছেন তারা তা গর্ব করে বলেন। এই বলার মধ্যে একটা অহংকার যুক্ত থাকে। বলেনআমরা নম:সূদ্র থেকে মুসলমান হয়নি, আমরা জাত মুসলমান।এই যে এক ধরনের অহংকার প্রকাশ এটা কি ঠিক? তারাওতো তাদেও দেশে পৌত্তলিকতা থেকে মুসলমান হয়েছেন। সেখানে তারা যে নম:সূদ্র থেকে মুসলমান হননি তার কি প্রমান আছে? তারা আমাদের পূর্বে মুসলমান হয়েছেন দাবী তারা করতে পারেন। কিন্তু তারা সবাই উচ্চবংশের এবং উন্নত রক্তের দাবী করতে পারেন না। পশ্চিম থেকে দেশে যারা এসেছেন তারা হয় সৈয়দ না হয় শেখ। এই যে শেখ, এটা হলো এক সাধারন পদবী। অর্থাৎ যারা সৈয়দ নয়, তারাই শেখ। সৈয়দ এসেছে রাসূলের বংশধারা থেকে। সুতরাং শেখ নামের ব্যক্তি যাঁরা বিদেশ থেকে এসেছেন, তারা সবাই উন্নত বংশের এবং এদেশের যরা নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে মুসলিম হয়েছেন তারা নিম্নবংশের এসব মনে করার কোনো কারণ নেই। আমাদের পরিচয় এখন দ্বিবিধ। নৃতাত্ত্বিকভাবে াামরা বা্গংালী এবং আদর্শগতভাবে মুসলিম। সুতরাং এদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ বাঙ্গালী মুসলমান।
এখানে এখনও কিছু সমস্যা রয়েছে। যা ধীরে ধীরে অপসৃত হবে। যেমন একদল লোক প্রান্কি চিন্তা থেকে বলে থাকেন, অতীতে আমরা বাঙ্গালী ছিলাম। ইসলাম গ্রহণের পর আমরা মুসলমান হয়ে গেছি। এখন আমরা বাঙ্গালী নই আমরা শুধুই মুসলিম। কথাটা শুনতে খুবই যুক্তিযুক্ত মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে দুনিয়ার সব মুসলিম এমন আত্মপরিচয় কি দেখানো যাবে? যাবে না। এটা এক ধরনেরভারচুয়ালবিষয়। এক ধরনেরইলিউশন দুনিয়ার চলতি বান্তবতার সাথে এর কোন মিল নেই। জাতীয়তা পাকিস্তানী হওয়া সত্ত্বেও পাঞ্জাবী, বেলুচি, সিন্ধি, পাঠান এসব নৃতাত্ত্বিক পরিচয় কখনো বিলীন হয়ে যায়নি। পাঞ্জাবী আবার দুভাগে বিভক্ত। পাকিস্তানী পাঞ্জাবী ভারতীয় পাঞ্জাবী। পাকিস্তানী পাঞ্জাবী বলতে সাধারণভাবে বুঝা যায় পাঞ্জাবী মুসলিম। আবার ভারতীয় পাঞ্জাবী বলতে পাঞ্জাবী শিখ। এর ক্ষীণ ব্যতিক্রম যে নেই, তানয়। যেমন পাঠান বলতে আমরা মুসলিম বুঝি। অথচ পাঠান হিন্দুও তো যথেষ্ট রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাঙ্গালী বললে সাধারণভাবে হিন্দুকে বুঝা যাবে না। অথচ পশ্চিম বাঙ্গালী বললে চট করে হিন্দুকে বুঝা যাবে। মোঘল বললেই আমরা মুসলিম বুঝি। অথচ মুসলিম নন এমন মোঘলের অস্তিত্ব মোঘল আমলেই ছিল।
আরবের মুসলমানরা নিজেদেরকে শুধু মুসলিম বলে পরিচয় দেয় না। মোটা দাগে বলেএ্যারাবিয়ান মুসলিম অর্থাৎ আরবীয় মুসলিম। আবার দেশ ভেদে এর রকমফের আলাদা। সৌদী, ইরাক, সিরিয়, মিশরী, লিবীয়, জর্দানী ইত্যাদি অভিদায় বিশ্লেষিত হয়। ইরানের মানুষ কখনো বলেনা যে আমরা মুসলিম। বলে ইরানী মুসলিম। পাশা পাশি দেশ। তবু ইন্দোনেশিয়ানরা  বলে আমরা ইন্দোনেশিয়ান মুসলিম এবং মালেশিযান বলে আমরা মালেশিয়ান মুসলিম।
দেশ, জাতি এবং নৃতাত্ত্বিক পরিচয়কে কেউ অস্বীকার করছে না। কারণ সংস্কৃতি। নিজস্ব সংস্কৃতি। নিজস্ব অস্থিত্বকে কেউ উপক্ষো বা অবজ্ঞা করে না। নিজের বিভিন্ন পরিচয় নিয়েই আপন সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। ভাল হতো যদি আমাদের দেশের নাম শুধুবাংলাহতো। তাহলে মাঝে বাংলাদেশী হওয়ার প্রয়োজন হতো না। বাঙ্গালী মুসলিম বা বাঙ্গালী হিন্দু পরিচয়ে আত্মস্থ থাকতে পারতাম। এখন আমাদের তিনটি পরিচয়: বাঙ্গালী, মুসলিম এবং বাংলাদেশী। এই তিনটি বা সংক্ষেপে অন্তত: ২টি পরিচয় নিয়ে আমাদেও সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। আমরা বাঙ্গালী এবং আমরা মুসলিম।
পৃথিবীর সকল দরজা এবং জানালা খোলা। ভেতরের আলো বাতাস যেমন বাইওে যাবে, তেমনি বাইরের আলো বাতাসও ভেতরে ঢুকবে। বাঙ্গালী এবং মুসলমান নিজেদেও সবকিছু বিলাবে কিন্তু সবকিছু অবলীলায় গ্রহন করতে পারবে না। বাঙ্গালীত্ব এবং মুসলমাণিত্বকে অক্ষুন্ন রেখে তাকে গ্রহণ-বর্জন করতে হবে। বর্জনের ক্ষেত্রে কট্টর বা প্রান্তিক হওয়া যাবে না। আদর্শকে আহত কওে না, এমন নতুন নতুন পালা-পার্বন বা উৎসবকে গ্রহণ করতে অসুবিধা কোখায়? অরিয়েনটেশন এবং সংস্কারের মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে উজ্জ্বল, পবিত্র মানবিক করতে হবে।
বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশকে যারা সেকুলার দেশ বানাতে চায়, তারা খুব মুখরোচক ভাবে শিকড় সন্ধানের কথা বলে। তাদের ধারণা শিকড় খুঁজতে গেলে সনাতন ধর্ম সংস্কৃতির জায়গায় তারা পৌছতে পারবে। শুধু পৌছা নয়, ওই সংস্কৃতির বতৃমার রূপ লাবন্যেও তারা অবগাহন করতে পারবে। সে কারণেই আমাদের দেশের সেকুলারগণ ভারতীয় সংস্কৃতির অনুরক্ত ভক্ত। তারা নব্য ভারতীয় সংস্কৃতির প্রচার প্রসারে নিবেদিত। অর্থাৎ তারা মুসলমানিত্বকে বাদ দিয়ে বাঙ্গালিত্বকে ধারন করতে চান।
অপরদিকে যারা দেশকে ইসলামী দেশ বানাতে চান, তারা আবার এদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, লোকাচার, জীবনাচরণ সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা, অবহেলা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্বীকার করেন বা মূল্যায়ণ করেন না। দেশীয়, স্থানীয় এবং লোকজ বিষয়কে অস্বীকার করে থিউরিটিক্যাল ইসলামকে জনগনের উপর চাপাত চান। এদেশের প্রকৃতি আলো, বাতাস, জলবায়ু তথা স্থান-কাল-পাত্রকে উপেক্ষা করে আল্লাহর ধর্ম হিসেবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করতে চান। গত দেড় হাজার বছরে ইসলামী আদর্শ জীবন ব্যবস্থার স্বপক্ষে যত কাজ হয়েছে, তাকে উপেক্ষা করে তারা বলতে চান ৫০ দশক থেকে এখানে সঠিক ইসলামের কাজ শুরু হয়েছে। ইসলামের পূর্ববর্তী কাজকে তারাএনডোরসকরতে চান না। এটাও একটা বড় ভুল এবং ভ্রান্তি। দেশীয় না করতে পারলে ইসলামের সৌন্দর্য প্রোথিত বিকাশ করা সম্ভব হবে না।

⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN

🔗 MY OTHERS CHANNELS

🔗 FOLLOW ME

🔗 MY WEBSITE

🔗 CALL ME
+8801819515141

🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com

#সংস্কৃতি
#বাংলাদেশী_সংস্কৃতি
#ইসলামী_সংস্কৃতি
#মঞ্চনাটক
#মোলাকাত
#Molakat
#Culture
#Bangladeshi_Culture
#Islamic_Culture
#Literature
#Bengal_Literature
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মাহবুবুল_হক

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.