ভেজা চোখ ।। হাসান রুহুল
সুরুজ আলী ঘপাঘোপ দুপুরের খাবার শেষ করে নদীর ঘাটে গেলো। চালালকান্দী ব্লক দিয়ে ঘেরা বেরি বাঁধের সামানে ছেলেগুলো দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ। ঈদের একদনি পরে পাড়ার ছেলেদেরে সাথে আমিও গেলাম শ্যালো মেশিনের নৌকা নিয়ে নদীতে ঘুরতে। নৌকার গোলিতে বসে অবিরাম তাকিয়ে আছি যৌবন ভরা নদীর মাঝে জেগে উঠা চরের দিকে। শত স্মৃতি এসে দোল দিচ্ছে মনের বারান্দায়। মনের টাইম মেশিন চালু করে ফিরে গেলাম বিশ বছর আগের দিনগুলোতে। কত দিন, কত সন্ধ্যা, কত যে রাত কেটেছে এই নদীর চরে। রাত জেগে আখের রসের কড়াইয়ে জ¦াল দেওয়া। গুড় বানানো। ভরা নদীতে সাঁতার কাটা। গরুর ঘাস কাটা। ফুটবল খেলা।
মেশিনের ভটভট শব্দের তালে ঢেউর ছন্দে যমুনার যৌবনের বুক চিরে তরতর করে এগিয়ে চলছে আমাদের নৌকা। যমুনার নির্মল বাতাসে সজিব মনের গহিনে বইছে ভালো লাগার পরশ। আনমনে তাকিয়ে আছি উদার যমুনার দিকে। দূরের গ্রামগুলো কুয়াশায় ঢেকে যাওয়া ছবির মতো দেখা যায়। জেগে উঠা চরের বুকে দাদাজানের শুভ্র চুল হয়ে কাশফুলগুলো হালকা বাতাসে দোলছে প্রিয়সির আলিঙ্গনের মতো।
সুরুজ এসে পাশে বসতেই ভাবনার ছন্দপতন ঘটে। ওকে বললাম,
-
-নৌকার হাল কাকে ধরতে দিয়েছিস।
সুরুজ মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
-
-কোনো চিন্তা করেন না ভাইজান। কামালকে ধরতে দিয়েছি। আমার মতো এখনো পাকা হয়ে উঠেনি। পাকা ড্রাইভার না হলে এই যমুনার পেটে নৌকা চালান যায় না। সব জানতে হয় ভাইজান। তাই ওকে হাল ধরতে দিয়েছি, হাত পাকা হোক।
-সব বলতে কি কি জানতে হয় সুরুজ?
-
-নদীর বাঁক চিনতে হয়। পানি চিনতে হয়। টেউ চিনতে হয়। ¯্রােত চিনতে হয়। রাতের জোছনার সাথে তারাগুলোকে চিনতে হয়। আর চিনতে হয় নদী পারের গ্রাম ও গ্রামের মানুষগুলোকে।
-তাহলে তো অনেক কিছুই জানতে হয়রে সুরুজ।
-আর একটি জিনিস থাকতে হয় ভাইজান। সেইটা হলো বুকের সাহস। এই সাহস না থাকলে রাত-বিরাতে নৌকা চালনো যায় না।
সুরুজের পান চিবানো শেষ হলে মনের সুখে একটা গান ধরে। সাথে সব ছেলেরাও ধরে উঠে
“নিথুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধুরে ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই”
আহ্ । কী সেই গানের মিষ্টি সুরের কলতান। উচ্ছ্বাসিত তরুণ-যবুকের দল খুশির ঢেউয়ে দুলছে। কতোই না আনন্দ পাইচ্ছে তারা। কতো স্বপ্ন ভাসে তাদের চোখে।
নৌকার গতি আরো বেড়ে গেলো। সাঁই সাঁই করে চলেছে সামনের দিকে। হাতরে ডান পাশে একটি গ্রাম চোখে পড়ল। গ্রামটির এক পাশে আখের ক্ষেত। সামনের দিকে পাট কাঠি আটি বেঁধে শুকাতে দেওয়ার দৃশ্য। গ্রামটির দক্ষিণ পাশে মোবাইলের একটি টাওয়ার দেখা যায়। নদীর পথ ভুলে যাওয়া মাঝিদের আশার আলো ওই টাওয়ার। অনেক দূর থেকে দেখো যায় গ্রামের বুকে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে টাওয়ারটি। গ্রামের দিকে তাকিয়ে থেকে সুরুজকে বললাম,
গ্রামটির নাম কি সুরুজ?
-
-ভাইজান, ওখানেই আমার জন্ম হয়। আমার দাদার বাড়ি। অনেক ঘটনা আছে ওই গ্রামে। শুনলে আপনাকে ভালো লাগবে।
আবার গ্রামের নাম জিজ্ঞেস করতেই সুরুজ হেসে উঠে বলে,
-
-ই গাঁয়ের নাম মানিকদার চর। বাপ-দাদার বাড়ি-ঘর ভাঙ্গে যমুনার পেটে গেল সেবার। তারপর আমরা চালুয়াবাড়ি চরে বসতি স্থাপন করি। সেই থেকে চালুয়াবাড়ি গ্রামে ছোট থেকে বড় হওয়া। এখানে মাঝে মাঝে যমুনা এসে হানা দেয় এখনো।
পিছন থেকে কামালের উচ্চ গলা শোনা যায়,
-
-সুরুজ ভাই, তেল শেষ হয়ে গেছে। আর অল্প আছে। তেল নিতে হবে।
সুরুজ উঠে মেশিনের কাছে যায়। ট্যাংকির মুখ খুলে একটা কাঠি ঢোকায়। তারপর দক্ষ চোখে কাঠির তেল ভেজা দাগ দেখে।
সুরুজ আবার আমার কাছে আসে। একটু উৎসাহ নিয়ে বসে। হয়তো গল্প করে সে মজা পাইচ্ছে।
-ভাইজান, সামনে যে গ্রামটা দেখছেন সেখানে নৌকা ভিড়াবো। তেল নিতে হবে। উজানে যাইতেছি তাই তেল একটু বেশি লাগতেছে।
-যেখানে আমারা বিরতি নিবো সেই জায়গার নাম কি।
-উলিয়া ঘাট। এই ঘাটে একটি ছোট বাজার আছে।
মুচকি হাসি দিয়ে সুরুজ আলী বলে,
-
-ভাইজান, এই গ্রামটি আমার অনেক পরিচিত ছিল। অনেক ঘটনা আছে এই গ্রামকে ঘিরে।
-পরিচিত ছিল মানে ?
-
-পরে বলবো ভাইজান। একটু সময় লাগবে বলতে।
উলিয়া ঘাটে নৌকা নোঙর করা হলো। ছেলেরা সব সেলফি তোলা নিয়ে ব্যস্ত। মাইকে কোন এক রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের আওয়াজ শোনা যায়।
শরতের বিকেলে আকাশে ভাসমান থোকা থোকা শাদা মেঘের মতো আমরা তিনটি দল পাশাপাশি হেঁটে বাজারের দিকে যাচ্ছি। বাজারের সামনেই একটি উচ্চ বিদ্যালয়। সেখানে রাজনৈতিক দলের মিটিং চলছে। ঘন্টাখানেক চা-নাস্তার বিরতি শেষে নৌকা রওনা করলো গুঠাইলের দিকে। একটি বিয়ের নৌকা আমাদের অতিক্রম করতেই দুই নৌকার ছেলে-মেয়েরা আনন্দে করোতালি দিয়ে উঠলো। আহা! কতো সুন্দর মনোরম দৃশ্য। মাইক বাজিয়ে নৌকা চলছে নতুন অতিথিকে ঘরে তোলার খুশির জোয়ারের তালে তালে। আর বর লজ্জায় আরোষ্ঠ হয়ে মুখে রুমাল চেপে মাথা নিচু করে বসে আছে। তবে তার চোখ থেকে দ্যুতিত হচ্ছে কাঙ্খিত কিছু পূর্ণ হওয়ার আলো।
পানি কেটে ঢেউর তালে ছান্দসিকভাবে নৌকা ছুটে চলেছে তরতর করে। উলিয়া ঘাটের ঠিক উল্টোদিক। অর্থাৎ পশ্চিম দিকে সুন্দর কাশবনের চর জেগে উঠেছে। ভাদ্ররে বিকেলে শাদা বকের ঝাকের মতো হয়ে উঠছে কাশফুলগুলো। পুবালি বাতাস দোল খেলে যায় কাশফুলের আগায় আগায়। যতো ভিতরে যাওয়া যায় ততো বড় আর ঘন কাশবন। মাঝ দিয়ে কয়েকটি হাঁটা পথের সরু রাস্তা সাপের লেজের মতো আরো ভেতরে দিক-বিদিক চলে গেছে। নদীর পানি শুকিয়ে গেলে, খাটিয়ামারি গ্রামের গোয়াল পাড়ার রাখালরা এখানে মহিশ চরায়।
অল্প কিক্ষণের মধ্যেই আমরা গুঠাইলে পৌঁছিয়ে গেলাম। নদীর তীরে এমন বাজার আর দেখিনি। অনেক বড় বাজার। প্রাথমিকে পড়ে আসা সমাজ বইয়ের ছবির মতো বাজার। নৌকা নিয়ে কেনাকাটা করতে আসতেছে দূরের গ্রামের লোকজন। বাদাম তোলা নৌকার চেয়ে কলের নৌকা বেশি। শেষ বিকালে নৌকাগুলো হেলে দুলে চলছে তাদের গন্তব্যে। বজারের পশ্চিম পাশে বড় করে প্যান্ডেল সাজানো আছে। রঙ-বেরঙের আলো জ্বলছে বিকাল থেকেই। দোকানে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতেই সুরুজ আলী কাছে এসে বসে।
মাইক থেকে ভেসে আসছে সার্কাস সার্কাস সার্কাস। সুরুজ বলে,
-
-ভাইজান, এখন তো আর সেই সার্কাস হয় না। হয়, যৈবতীর সার্কাস। দেখবেন ?
-
-না। হাতে সময় কম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। নদীপথ মানে বিপদের পথ। আর দেরি করা যাবে না। ওদেরকে ডেকে নিয়ে নৌকায় চলে এসো।
-ভাইজান একটা কথা বলি?
-
-বলো।
-এই গুঠাইল, উলিয়া ঘাট, ইসলামপুর জুড়ে আমার অনেক স্মৃতি আছে।
-তাই! বলো। শুনি।
-হো ভাইজান। এখন বলছি শোনেন; পৌষের দুপুরে নৌকা উলিয়া ঘাটে ভিরেছি। পাটের খ্যাপ নিয়ে এসেছি। এখান থেকে গাড়ি বোঝাই করে পাট নিয়ে যাবে ইসলামপুর সদরে, সেখান থেকে জামালপুর গুদামে। মহাজন আসতে অনেক দেরি হবে। ও জানে আমি ঘাটে বসে আছি। শিউলি ফুলের মতো চেহারা। কাঁচা লাউর ডগার মতো শরীর। হাসনা হেনার মতো তার চুলের ঘ্রাণ। চোখের চাহনিতেই মনটা ভরে যায়। কী তার উদার মন।
হঠাৎ করে সেই দিন শেফালির সাথে বিয়ে হয়। শীতের রাত। শুক্ল পক্ষের জোছনার আলো মোমের মতো গলে পড়ছে উঠানজুড়ে। সেই রাত থেকে আমার ছায়া হয়ে থাকতো সব সময়।
-থাকতো মানে। এখন সে কোথায়?
-
-বলছি ভাইজান।
-এভাবে রাজজোটক হয়ে সুখের দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল ভালোই। শেফালির পরম ভালোবাসায় আমার হৃদয় ভরে উঠে খুশির জোয়ারে।
গেছি পাকুল্যা হাটে। মহাজন পাকুল্যা বাজার থেকে পাট কিনে। আমার মহাজন নামকরা মানুষ। সবার কাছে তিনি হাসান ডাকাত নামে পরিচিত।
রাত করেই বাড়ি ফিরছি। উঠোন ভর্তি মানুষ। শেফালির আলু থালু চেহেরা। তারপর সবই শুনলাম।
বিচারে পরিবর্তে হলো প্রহন। শেফালির সারা শীররে পাকা বাশের কঞ্চির দাগ। হাঁটতে পারছে না। মুখে কোনো কথা নাই শেফালির। নিরবে দুচোখ বেয়ে পানি ঝরছে। মাঝে মাঝে মুখ বাঁকা করে আৎকে উঠছে। পিঠে করে ঘরে নিয়ে এলাম। দুদিন পর একটু সুস্থ্য হয়ে উঠলো।
শেফালি আর আগের মতো নেই। ঘর থেকে বের হয় না। ঠিক মতো খাবার খায় না। শরীরের যতœ নেই না। আমার কাছে বসে না। কাছে আসতেই লজ্জা আর ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে উঠে তার রাঙা মুখ। মন মরা হয়ে থাকে। কি যেন ভাবে। হঠাৎ আমাকে বলে, ‘আমাকে ভুল বুঝবে না বলো? আমার কোনো দোষ নাই। কী নিষ্ঠুর পৃথিবী।’ একথাগুলোই বলেই দীর্ঘ নিঃশ্বাস শেফালির বুকের পাজর ভেঙে বের হয়ে আসে।
দিন তিনেক পর ভোর বেলায় উঠানের পিয়ারা গাছে আমার শেফালিকে ঝুলন্ত দেখতে পাই। ডিমের কুসমের মতো মুখটা কালো হয়ে গেছে। হয়তো চেয়ারম্যানের বড় ছেলেকে অপকর্ম থেকে বাঁচানোর কুট-কৌশলের প্রতি ঘৃণায় শেফালি রাগে মুখ কালো করে আছে। সেই কালো মুখ আমার চোখে ভাসবে চিরদিন।
-তারপর আর কি হলো সুরুজ ?
-
-তারপর থেকে এই উলিয়া ঘাট আর গুঠাইল হাটের সাথে সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়।
উলিয়া ঘাট আর গুঠাইল হাটে আসা বড় কথা নয়। মূলত নৌকা ভ্রমণই ছিল মূখ্য। তবুও দেখা হলো ইসলামপুরের গ্রামগুলো।
সূর্য পশ্চিম আকাশে উকি দিয়ে সন্ধ্যাকে হাত ছানি দিয়ে ডাকছে। হলুদ রঙের আভায় ভরে গেছে পশ্চিমাকাশ। সুরুজ নৌকা ছেড়ে দিল। মেশিনের ভট ভট শব্দে নৌকা এগিয়ে চলছে চালালকান্দির ঘাটের দিকে। গুঠাইল থেকে আমরা এখন সেই উলিয়া ঘাটের পশ্চিম পাশ দিয়ে যাচ্ছি। মেশিনের শব্দ ভেদ করে সেই কাশবন থেকে মেয়ালি চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসছে। সবাই কিছুক্ষণ স্তব্দ হয়ে রইলাম। সুরুজ অতি আগ্রহ নিয়ে নৌকা ভিরালো কাশবনের কাছে। চিৎকার আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেই চিৎকার বাতাসে প্রতিধ্বনি হয়ে কানে এসে বাজছে। লোকজনের আনাগোনার আওয়াজ পেয়ে আমাদের কাছে প্রায় চলে এলো তিনজনের সাথে একটি মেয়ে। মেয়েটি তখনো আকুতি করে বলছে-‘আমাকে এখন ছেড়ে দিন। আমি জানতাম না আপনারা এতো নিচু রুচির পশু। আমি সার্কাসে পেটের তাগিদে নাচ-গান করি কিন্তু সুখ বিলাসি নই।’
সুরুজ তখন হিংস্র হয়ে উঠে। চিৎকার দিয়ে বলে-‘তুই তো চেয়ারম্যানের বড় ছেলে।’ সুরুজের গলার রগগুলো আরো ফুলে উঠছে। পেশি লোহার মতো শক্ত হয়ে উঠলো। নৌকা থেকে নেমেই কয়েকটি কোপ বসাইয়া দিল চেয়ারম্যানের বড় ছেলে সায়মানের মাথায়। নদীর কিনারায় টলতে থাকা সায়মানকে এক লাথি দিয়ে ফেলে দিল যমুনার ¯্রােতে। রক্তে মেখে গেল সুরুজ আলীর হাতে ধরে থাকা মেশিনের হ্যান্ডেল। ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্ত মিশে গেল যমুনার ঘোলা পানিতে। সুরুজের দুই চোখ ভিজে উঠলো। গাল বেয়ে ঝরে পরা সেই পানি সুখের না দুঃখের, প্রতিশোধের না কষ্টের, হতাশার না আশার, ভয়ের না সাহসের তা শুধু সুরুজ আলীই জানে।
hasanruhul48@gmail.com
⭐ FOR ANY HELP PLEASE JOIN
🔗 MY OTHERS CHANNELS
🔗 FOLLOW ME
Facebook: facebook.com/molakat
Facebook: facebook.com/afsarnizam
Instagram: instagram.com/molakat
Instagram: instagram.com/afsarnizam
Twitter: twitter.com/afsarnizam
🔗 MY WEBSITE
🔗 CALL ME
+8801819515141
🔗 E-MAILL
molakatmagazine@gmail.com
#গল্প
#ছোটগল্প
#সাহিত্য
#বাংলাসাহিত্য
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#মোলাকাত
#সাহিত্য_ম্যাগাজিন
#ওয়েব_ম্যাগাজিন
#Molakat
#ShortStory
#Story
#Literature
#Bengali_Literature
#হাসান_রুহুল
No comments