বুলেট বুকে গোলাপপাখি ।। মিনহাজ ফয়সল


বুলেট
বুকে গোলাপপাখি
মিনহাজ ফয়সল
  
পাখিটার মুখের দিকে তাকালে আশ্চর্য এক অনুভূতি জাগে। মনের ভিতরটা কেমন জানি জুড়িয়ে যায়৷ সকল দুঃখ নিমিষেই হাওয়া হয়ে ওড়ে। আশ্চর্য এক শীতলতায় ভরে ওঠে বুক৷ মনের মাঝে নতুন এক আশা জাগে। আবার ভয়ও হয়। ভয় হয় এর জন্য যে, দারুণ এক অস্থির সময়ে বেড়ে উঠবে সে। অস্থির সময়ের চেয়ে অবশ্য অন্ধকার সময়ই বলা ভালো। বারুদের গন্ধে যে আকাশ ভারী হয়ে উঠেছে, তাকে আর কিই-বা বলা যেতে পারে। তবে যাই হোক, যেমন হোক এ অন্ধকার সময়কে অতিক্রম করে নতুন আলোর সূর্যোদয় আমাদের আনতেই হবে৷ অন্তত বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য আনতেই হবে। পাখিদের আগামীর জন্য। কেবল এখন– স্বাধীন মাটির জন্যই এত আয়োজন। এত রাত জাগা। এত কষ্ট। এত ত্যাগ। এত পরীক্ষা৷
 
ঘুমন্ত পাখির মুখের দিকে তাকিয়ে একাকী কথাগুলো ভাবছিল স্বাধীন। পাখির বয়স এখন তিন বছর। ভালোমতো কথাও বলতে পারে না। তবে যেন সব বুঝতে পারে। না-বলেই সবকিছু বলে দেয় সে। চোখ জুড়ে কিসের যেন এক দৃঢ় শপথ। বিশেষ করে যখন স্বাধীনের হাতের আঙুল মুষ্টি করে ধরে, তখন মনে হয় যেন চিৎকার করে হাত নাড়িয়ে মিছিলে মিছিলে শামিল হবার আহ্বান দিয়ে যাচ্ছে সে। বুকের ভেতর যেন দাউদাউ করে জ্বলে বিপ্লবের আগুন। চোখ দুটো নিমিষেই ছলছল হয় স্বাধীনের।মনে হয় যেন এক অতল নদীতে ডুবে যাচ্ছে সে।
কানে ভেসে আসে একটাই ধ্বনি-
 
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম…।’
 
‘স্বাধীন, এই স্বাধীন। স্বাধীন, এই স্বাধীন…। ‘
বিপ্লবের ডাকে সম্ভিত ফিরে পায় স্বাধীন। আলতো করে
পাখির কপালে একটা চুমো দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে সে। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এর মাঝেও বিপ্লবকে ঠিক চিনতে পারে সে। আলতো গলায় বলে, ‘বাকিরা কই? ‘
‘আছে তেঁতুল তলায়’। অস্ফুট স্বরে বলে বিপ্লব।
‘সবাই আছে তো? কেউ বাদ নাই তো? ‘
‘না-সবাই আসছে।’
 
গুড। আরও লোক বাড়াতে হবে৷ প্রত্যেক ঘর থেকে যাতে একজন করে হলেও পাই।
যে খেলা শুরু হয়েছে, সে খেলায় জিততেই হবে৷ কোনও ছাড়াছাড়ি নেই। বিপ্লবের কন্ঠে বিপ্লবীদের মতো শোনায়৷ স্বাধীন কিছু বলে না৷ চোয়াল শক্ত হয়ে যায় ওর। চোখমুখ ঠিকরে যেন আগুন বের হচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে তেঁতুল তলায় পৌঁছে যায় তারা। দশ-বারোজন যুবক অপেক্ষায় বসে আছে, সবার চোখেমুখে আগুন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক অদম্য নেশা। আর সেই আগুনকে আরও তাতিয়ে দিতেই স্বাধীন বলতে শুরু করলো-
 
‘ ভাইয়েরা এই রাত্রি দ্বিপ্রহরে আমরা লুকিয়ে দেখা করছি কেন? কেন আমাদের যখন তখন দেখা করার স্বাধীনতা নেই? কেন আমরা সভা করতে পারি না, মিছিল করতে পারি না। মনের কথা বলতে পারি না? কারণ আমাদের সব অধিকার ছিঁড়ে নিতে চাইছে কিছু শেয়াল- শকুন। কিন্তু আমরা যুবকেরা বেঁচে থাকতে তা কখনওই হতে দেবো না। মরার আগে মরার ইচ্ছা আমাদের নেই। আমাদের সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। এখন আর পিছু ফেরার কোনও রাস্তা নেই৷ এখান থেকেই হয় বিজয় নয়তো না-ফেরার দেশে। মাঝামাঝি কোনও অবস্থান আমাদের নেই৷ অন্য কোনও স্বপ্ন আমাদের নেই৷ অন্য কোনও শব্দ আমাদের কানে বাজে না।
 
আমাদের কানে বাজে কেবল একটাই শ্লোগান-
‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ…’
 
দুই.
 
আফজাল সাহেব এই এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একজন৷ স্বাধীন তারই ছেলে। আর তিন বছরের ছোট্ট পাখি তার একমাত্র মেয়ে৷ বেশ পরিপাটি সংসার তার। আর এই পরিপাটি সংসার যার সাধনার ফসল তিনি রাবেয়া খাতুন।
আসরের নামাজ শেষে চায়ের দোকানে বসেছেন মুরুব্বিরা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে নানান গল্প হয়৷ নানান আলোচনা হয়। সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন স্বাধীনতা৷
 
‘যুদ্ধ শুরু হইয়া গ্যাসে।’ ধরা গলায় বলেন মুকিত সাহেব৷
‘ হ। শুরু হইবই। শুরু না–হইয়া উপায় আছে? ‘
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেন আফজল সাহেব।
যুদ্ধে যখন নামছি তখন ভালোমতোই নামতে হইব।
 
‘ হুম, হারামজাদাগো ছাড়াছাড়ি নাই।‘ আমিন মাস্টারের কণ্ঠে হুংকারের ছাপ।
আফজাল সাহেব ধীর গলায় বলেন, ‘দেশের মাটি রক্ষা করতে হইলে তরুণ আর যুবকদের ঘর থাইকা বাইর হইতে হইব।’
আফজাল সাহেবের এই কথার সঙ্গে সঙ্গে আহমদ সরদার একটু বাঁকা চোখে তাকায়। কেমন যেন একটা দৃষ্টি তার। যেন এই কথার সঙ্গে দারুণভাবে একমত নন তিনি।
 
‘যাই হোক শেখ সাহেব যে হুংকার দিছেন, তাতেই সব ছেলেপুলে মাঠে নাইমা পড়ব। এই দরাজ গলার কথা শুনে কি বসে থাকা যায় মিয়া। রক্তে তো আগুন জ্বইলা ওঠে। শরীরের ভিতর কেমন কেমন ঠেকে। মনে অয় সব ভাইঙ্গা ফালাই।’
একটানা সব বলতে থাকেন মুকিত সাহেব৷
পিচিক করে পানের ফিক ফেলে আহমদ সরদার বলে, ‘ওই মিয়া থাম। তুমি তো মিয়া অহনই সব ভাইঙ্গা ফালাইবা? কিছু একটা শুইনাই শুধু ফাল পাড়ো। দেশ ভাগ হইলে কী লাভ হইব? একটু বুঝে একসঙ্গে থাকলে অনেক সুবিধা পাইবা। দেশটা অনেকদূর আগাইব। শান্তিতে থাকতে পারবা।‘ বলেই খয়েরি দাঁত বের করে বিদঘুটে একটা হাসি দেয় সে।
 
সবাই তার দিকে একনজরে তাকায় আর চোয়াল শক্ত করে ঘৃণার স্বরে বলে, ‘রাজাকার শালা!’
 
চারিদিকে যুদ্ধের দামামা। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। স্বাধীনের নেতৃত্বে একটা দল যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। আর কয়েকদিনের মধ্যেই তাদের অপারেশন শুরু হবে। সারা রাত জেগে জেগে ট্রেনিং নিচ্ছে তারা। তাদের দলে সবাই বয়সে তরুণ, যুবক। সবার বুকেই আগুন। যেভাবেই হোক দেশকে তারা শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করবেই। বুক জুড়ে দৃঢ় প্রত্যয়। মন জুড়ে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে চলার আকাঙ্খা।
 
‘ তবে মুক্তিসেনারা যেমন ইতিমধ্যে যুদ্ধ শুরু করেছে। কেউ কেউ অপেক্ষায় যুদ্ধ শুরু করায়। তেমনই গ্রামে মহল্লায় কেউ কেউ হাত মিলিয়েছে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে। তারা চায় না এদেশ শৃঙ্খল মুক্ত হোক। তারা চায় না এদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। তারা চায় না আমাদের একটা পতাকা থাকুক। তারা চায় না স্বাধীন মাটিতে বুক ফুলিয়ে হাঁটি। শুধু পাক হানাদাররাই নয় বরং এদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। কারওই রেহাই নেই। হয়ত জীবন থাকবে, নয়তো নয়। তবে এ মাটির একটি কণাও কারও দখলে যেতে দেবো না।
জয় বাংলা…। বলল স্বাধীন।
 
স্বাধীনের সঙ্গে সঙ্গে সবাই সমস্বরে চিৎকার বলে, ‘জয় বাংলা।’
 
ট্রেনিং চলছে। চলছে লেফট রাইট। বন্দুকের সঙ্গে হাত, কাঁধ আর মনের এক দারুণ সখ্য। আর মাত্র দুদিন পরেই অপারেশন শুরু। এলাকা ছেড়ে যেতে হবে বহুদূর। আর হয়ত ফেরা হবে না প্রিয় গাঁয়ে। আর হয়ত দেখা হবে না প্রিয় মায়ের মুখ। আর হয়ত চুমু খাওয়া হবে না প্রিয় পাখিকে। আর হয়ত দেখাই হবে না এই বাংলার মুখ। স্নিগ্ধ প্রকৃতি, সবুজ-শ্যামলিমায় বুক ভরে নিঃশ্বাস হয়ত আর নেওয়া হবে না৷ আবার হতেও পারে যুদ্ধ শেষে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে বীর দর্পে ফিরবো আবার মাটিতে। আবার হয়ত ফিরে পাবো সব৷ সবকিছু হয়ত আগের মতোই ধরা দেবে। আগের মতোই স্বাধীন ফিরবে স্বাধীন হয়ে, সত্যিকারের স্বাধীন হয়ে। আর তা পেতে রক্ত ঝরবেই। হয়ত শরীরের নয়তো মনের। তবে রক্তেই শেষ সমাধান। রক্তের বিকল্প নেই। হয়ত নেবো নয়তো উজার করে দেবো৷
 
তিন.
 
ঠক ঠক ঠক ঘড়ির দিকে তাকায় আফজাল সাহেব। রাত্রি দুইটা। এত রাতে কে দরজায়? চোখ মুছতে মুছতে দরজার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে যান আফজাল সাহেব। দরজার খিল খুলতেই দু-চারজন মিলিটারি ঘরে ঢুকে যায়।
ঘটনার আকস্মিকতা বুঝে ওঠার আগেই একজন বলে ওঠে, ‘তুমহারা বেটা কাহা হে?’
কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না আফজাল সাহেব৷
শুধু অস্ফুট স্বরে বলেন, ‘বে-টা কাহা…মানে? ‘
কথার ফাঁকে কয়েকজন মিলিটারির পিছনে আহমদ সরদারকে দেখতেই ব্যাপারটা খানিক আঁচ করতে পারেন আফজাল সাহেব। কিছু একটা বলতে যাবেন এমন সময় আহমদ সরদার পান খাওয়া দাঁত বের করে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বলে, স্বাধীন বাবাজি রে একটা ডাক দেন। শুনলাম স্বাধীন বাবাজিরে নাকি দ্যাশ স্বাধীন করতে পাঠাইছেন?’
 
পাশের ঘর থেকে দৌঁড়ে আসেন রাবেয়া বেগম। পাগলের মতো বলতে থাকেন, ‘ কী হয়েছে আমার স্বাধীনের? কী হয়েছে আমার স্বাধীনের? ‘
আহমদ সরদার বলে, ‘ কিছু হয়নাই ভাবি সাব। ক্যাপটেন সজিদ সাব একটু দেখা করতে আইছেন ভাতিজার লগে৷ একটু ডাক দেন। ‘
এমন সময় মিলিটারি ভিতরের ঘর থেকে এসে বলতে পাগল, ‘ও বেটা… ঘরকো নেই সাব।’
আফজল সাহেবের চোয়াল শক্ত হয়। দৃঢ়কণ্ঠে বলতে শুরু করেন, ‘হ্যাঁ আমার পোলা রে যুদ্ধে পাঠাইছি। তোমাগো হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে পাঠাইছি।’
 
কথাটা শেষ করতে পারলেন না আফজল সাহেব। ক্যাপটেন সাজিদের একটা বুলেট সরাসরি বিঁধে যায় বুকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আফজল সাহেব।
রাবেয়া বেগম দৌড়ে এসে স্বামীকে চেপে ধরে আর্তনাত করতে থাকেন৷ ওদের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাবেন এমন সময় আরেকটা বুলেট তাকেও ছেদ কিরে বেরিয়ে যায়। নিথর হয়ে আসে দুজনের দেহ।
 
মিলিটারিসহ আহমদ সরদার ঘর থেকে বেরিয়ে যাবেন এমন সময় পাখি , ‘দয় বাললা ( জয় বাংলা) , দয় বাললা ( জয় বাংলা)।’ বলতে বলতে বেরিয়ে আসে পাশের ঘর থেকে। বাবা-মায়ের নিথর দেহের কাছে এসে দাঁড়ায়। তার ডান হাত শক্ত করে চেপে ধরা ভাইয়ের দেওয়া বাংলাদেশের পতাকা। মুষ্টিবদ্ধ হাতে এই পতাকাই যেন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো প্রতিবাদ৷ ঘরের বাহির থেকে সবাই পাখির দিকে তাকায়।
ক্যাপটেন সাজিদ আহমদ সরদারের দিকে একনজর দেখে বলে, ‘এই শালা, ফুল ফ্যামেলি কো মুক্তি হ্যায়। কাভি কিসিকো জিন্দা নেহি রাখুংগা।’
বলেই সরাসরি গুলি করে দেয় পাখিকে। রক্তের স্রোত গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। শান্ত সৌম্য স্নিগ্ধ জোছনাভরা রাতে পড়ে আছে রক্তাক্ত তিনটি নিথর দেহ৷ পাখির হাতে এখনও ধরা আছে পতাকা। রাত্রি ভেদ করে যে পতাকার শপথ ছড়িয়ে পড়ছে স্বাধীনদের মনে মমে। পতাকা যেন ক্রমাগত তাদের মনে শ্লোগান তুলছে – জয় বাংলা! জয় বাংলা! জয় বাংলা!
 
 
 
মিনহাজ ফয়সল
গল্পকার ও নাট্যাভিনেতা
মদিনা মার্কেট, সিলেট।
minhazfoysolbd@gmail.com

No comments

নির্বাচিত লেখা

আফসার নিজাম’র কবিতা

ছায়া ও অশ্বথ বিষয়ক খ-কবিতা এক/ক. সূর্য ডুবে গেলে কবরের ঘুমে যায় অশ্বথ ছায়া একচিলতে রোদের আশায় পরবাসী স্বামীর মতো অপেক্ষার প্রহর কাটায় প্রাচী...

Powered by Blogger.